কক্সবাজার সদর হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ও উপজেলা। এই উপজেলাকে কেন্দ্র করেই মূলত সমগ্র কক্সবাজার জেলার মূল প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভৌগোলিকভাবে কক্সবাজার সদর উপজেলার উত্তরে ঈদগাঁও উপজেলা ও চকরিয়া উপজেলা, দক্ষিণে রামু উপজেলা, পূর্বে বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও রামু উপজেলা এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও মহেশখালী চ্যানেল অবস্থিত। বিখ্যাত বাঁকখালী নদী এই উপজেলার বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে, যা এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশাসনিক পটভূমি ও বিবর্তন
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে কক্সবাজার থানা সর্বপ্রথম ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে পৌরসভা গঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে স্থানীয় সরকার কাঠামোর সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ২০২১ সালে এর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নকে পৃথক করে নতুন ‘ঈদগাঁও’ উপজেলা গঠন করা হয়। বর্তমানে কক্সবাজার সদর উপজেলা কক্সবাজার পৌরসভা এবং একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত, যার মধ্যে জেলা প্রশাসক কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, আদালত চত্বরসহ সরকারের যাবতীয় নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্র অবস্থিত।
অর্থনীতি, পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
কক্সবাজার সদর দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত, লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট ও কলাতলী পয়েন্টের মতো প্রধান পর্যটন এলাকাগুলো এই সদর উপজেলাতেই অন্তর্ভুক্ত। হোটেল-মোটেল জোন, আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা রিসোর্ট এবং ঝিনুক ও বার্মিজ মার্কেটের মতো বিশাল বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এই পর্যটন খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এছাড়া বাঁকখালী নদীর মোহনায় অবস্থিত ফিশারি ঘাট দেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোর একটি, যা থেকে বিপুল পরিমাণ মৎস্য জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। যোগাযোগ ক্ষেত্রে কক্সবাজার বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন এবং কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের সূচনা এই সদর উপজেলা থেকেই হয়েছে।
জনমিতি, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবন
বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি কক্সবাজার সদরে রাখাইনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বহু শতাব্দীর বসতি রয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রাচীন রাখাইন পাড়া, অ্যাগমেধা ক্যাং ও রাধাকান্ত আনন্দ বৌদ্ধ বিহার এখানকার বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। দেশের প্রধান সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন এই সদর এলাকাতেই স্থাপিত, যা সমগ্র বাংলাদেশের ডিজিটাল সংযোগের মূল ভিত্তি। আধুনিক নগরায়ণ, আন্তর্জাতিক পর্যটন, মৎস্য বন্দর এবং কৌশলগত উপকূলীয় সুরক্ষার সমন্বয়ে কক্সবাজার সদর বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও অপরিহার্য প্রশাসনিক অঞ্চল।