নটমল্লার একটি অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘মল্লার’ অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। মল্লার রাগের নাম শুনলেই আমাদের মনে পড়ে বর্ষার কথা, মেঘের গর্জন, এবং বৃষ্টির অঝোর ধারা। তবে নটমল্লার কেবল বর্ষার রাগ নয়, এটি ‘নট’ (Nat) রাগের আভিজাত্য এবং ‘মল্লার’ রাগের আর্দ্রতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এই রাগটি মূলত মধ্যরাত্রিতে পরিবেশন করার জন্য নির্ধারিত।
নটমল্লার রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
-
মিশ্র রাগ: নটমল্লার মূলত দুটি রাগের মিশ্রণে গঠিত, ‘নট’ এবং ‘মল্লার’। নট রাগের চঞ্চলতা ও বীরত্বপূর্ণ ভাব এবং মল্লার রাগের করুণ ও স্নিগ্ধ ভাব, এই দুইয়ের সমন্বয়ে নটমল্লার এক অনন্য রূপ ধারণ করে।
-
স্বরবিন্যাস: এই রাগের আরোহণ ও অবরোহণে কিছু বিশেষ স্বরপ্রয়োগের নিয়ম আছে। এতে নিখাদ ‘নি’ (নিষাদ) এবং কোমল ‘নি’-এর ব্যবহার অত্যন্ত শৈল্পিক। এর বিন্যাস শুনলে মনে হয় যেন গম্ভীর মেঘের মাঝে বিদ্যুতের চমক খেলছে।
-
মেজাজ: নটমল্লার রাগের মধ্যে এক ধরণের গাম্ভীর্য ও গরিমা থাকে। এটি বিরহ এবং ভক্তির রস প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর সুরের গভীরতা শ্রোতার মনকে এক প্রশান্ত অথচ গম্ভীর ভাবনায় ডুবিয়ে দিতে পারে।
বাংলা সংগীতে নটমল্লার: বাংলা গানে রাগপ্রধান ধারার বিবর্তনে নটমল্লারের মতো গম্ভীর রাগের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অতুলপ্রসাদ সেনের মতো সুরকাররা যখন বাংলা গানের সুর সৃষ্টি করেছেন, তখন তাঁরা বাণীর গভীরতা অনুযায়ী রাগ নির্বাচন করেছেন।
-
অতুলপ্রসাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা: অতুলপ্রসাদ সেন কেবল জনপ্রিয় বা সহজলভ্য রাগের ওপর নির্ভর করেননি, বরং নটমল্লারের মতো জটিল ও গম্ভীর রাগের সুরকেও তিনি বাংলা গানে প্রয়োগ করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা গানের বাণীর যে বেদনা বা ভক্তি, তা যেন রাগের গাম্ভীর্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
-
শৈল্পিক উৎকর্ষ: নটমল্লারের মতো রাগে গান রচনা করা একজন সুরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই রাগের সুর খুব সাবধানে প্রয়োগ করতে হয় যাতে গানের কথার অর্থ ও সুরের মেজাজ একে অপরের পরিপূরক হয়। বাংলা সংগীতে এই রাগের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, বাংলা গান কতখানি উচ্চমার্গীয় এবং শাস্ত্রীয় ভাবধারায় পুষ্ট হতে পারে।
কেন নটমল্লার অনন্য: নটমল্লারের সুর শুনলে মনে হয় প্রকৃতি যেন তার নিজের ভাষায় কথা বলছে। মেঘের গর্জন থেকে বৃষ্টির মৃদু স্পর্শ, সবই এই রাগের সুরের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে। রাগপ্রধান গানের আসরে যখন নটমল্লারের সুর বাঁশিতে বা কণ্ঠে ফুটে ওঠে, তখন পরিবেশটি এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত হয়। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং সুরের এক গভীর সাধনা।