দ্য গ্রেট গেম

‘দ্য গ্রেট গেম’ (The Great Game) বা ‘মহা খেলা’ হলো ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিশ্বের দুই শীর্ষ পরাশক্তি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত এক সুদীর্ঘ ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব। ঐতিহাসিক এই পরিভাষাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোয়েন্দা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আর্থার কনোলি। পরবর্তীতে বিখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং তাঁর বিখ্যাত ‘কিম’ (Kim) উপন্যাসের মাধ্যমে এই শব্দগুচ্ছটিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলেন।

সংঘাতের মূল কারণ ও কৌশল

এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান উপনিবেশ ‘ভারতবর্ষ’-এর নিরাপত্তা নিয়ে ব্রিটিশদের চরম উৎকণ্ঠা এবং এশিয়ায় রুশ সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক সীমানা বিস্তার। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ানরা যখন ধীরে ধীরে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন আমিরাত ও খানাত (যেমন: বোখারা, খিভা, সমরকন্দ) দখল করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের মনে তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয় যে, রাশিয়া হয়তো আফগানিস্তানের দুর্গম গিরিপথগুলো ব্যবহার করে সরাসরি ব্রিটিশ ভারতে আক্রমণ চালাবে। এই ভীতি থেকেই শুরু হয় এক নীরব যুদ্ধ। সরাসরি কোনো বৃহৎ সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে উভয় পক্ষই এই অঞ্চলে ব্যাপক গোয়েন্দাগিরি, ছদ্মবেশী অনুসন্ধান, মানচিত্রাঙ্কন এবং কূটনৈতিক কূটচালের আশ্রয় নেয়।

আরো পড়ুন:  দ্য গ্রেট গেম

বাফার স্টেট এবং প্রক্সি যুদ্ধ

দুই বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝখানে সরাসরি সীমান্ত সংঘাত এড়াতে আফগানিস্তান, পারস্য (বর্তমান ইরান) এবং তিব্বত পরিণত হয় ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চলে। তবে আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব নিশ্চিত করতে ব্রিটিশদের প্রথম ও দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানেও জড়াতে হয়েছিল। অন্যদিকে, রুশরা তাদের রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সামরিক ফাঁড়ি স্থাপনের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে থাকে। গুপ্তচর, অভিযাত্রী এবং মানচিত্রকাররা—যাদের অনেকেই ছিলেন স্থানীয় অধিবাসী—এই বিপজ্জনক খেলায় উভয় পক্ষের হয়ে দাবার ঘুঁটির মতো কাজ করেছেন।

আরো পড়ুন:  দ্য গ্রেট গেম

সমাপ্তি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন পটপরিবর্তন ঘটে। ইউরোপে জার্মান সাম্রাজ্যের সামরিক উত্থান এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি ব্রিটেন ও রাশিয়া উভয়কেই নিজেদের মধ্যকার পুরনো বিরোধ মিটিয়ে ফেলার তাগিদ দেয়। এর ফলস্বরূপ, ১৯০৭ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে ‘অ্যাংলো-রাশিয়ান কনভেনশন’ (Anglo-Russian Convention) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে পারস্যকে দুটি প্রভাব বলয়ে ভাগ করা হয়, তিব্বতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত হয় এবং আফগানিস্তানকে ব্রিটিশদের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে রাশিয়া স্বীকৃতি প্রদান করে। এর মধ্য দিয়েই ধ্রুপদী ‘দ্য গ্রেট গেম’-এর আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। তবে এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবেই ওয়াখান করিডোর ও ডুরান্ড লাইনের মতো ভূ-রাজনৈতিক সীমানাগুলো নির্ধারিত হয়েছিল, যা আজও মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে।

আরো পড়ুন:  দ্য গ্রেট গেম