বিজয় সেন

বিজয় সেন (আনুমানিক ১০৯৮–১১৬০ খ্রি.) প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সেন বংশের আদি পুরুষ সামন্ত সেনের পৌত্র এবং হেমন্ত সেনের পুত্র ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি তাঁর দীর্ঘ প্রায় ৬২ বছরের রাজত্বকালে সামরিক পরাক্রম ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন বাংলাকে একক শাসনাধীনে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলার রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে এবং একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠনে তাঁর অসামান্য অবদান তাঁকে বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

একজন দুর্ধর্ষ ও পরাক্রমশালী যোদ্ধা হিসেবে বিজয় সেন তাঁর সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রাজসভার বিখ্যাত কবি উমাপতি ধর রচিত শিলালিপি ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ থেকে তাঁর দিগ্বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি গৌড়ের শেষ দিককার দুর্বল পাল রাজাদের (সম্ভবত মদনপাল) বিতাড়িত করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলায় আধিপত্য স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বর্মণ রাজবংশকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে বঙ্গ অঞ্চল অধিকার করেন। তাঁর সামরিক অভিযান কেবল বাংলার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি কামরূপ (আসাম), কলিঙ্গ (উড়িষ্যা) ও মিথিলা (বিহার) পর্যন্ত সেন সাম্রাজ্যের সীমানা সম্প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন সামরিক সাফল্যের ফলেই সেনরা একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক সামন্ত শক্তি থেকে বাংলার সর্বময় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি বিজয় সেন একজন সুশাসক এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রবল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সুশাসন পরিচালনার সুবিধার্থে তাঁর সাম্রাজ্যের দুটি প্রধান রাজধানী ছিল—রাঢ় অঞ্চলের বিজয়পুর এবং পূর্ব বাংলার বিক্রমপুর। ধর্মীয় দিক থেকে তিনি ছিলেন গোঁড়া শৈব (শিবের উপাসক)। তিনি রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী সংলগ্ন দেওপাড়া নামক স্থানে প্রদ্যুম্নেশ্বর শিবের এক বিশাল ও মনোরম মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সুদীর্ঘ ও স্থিতিশীল শাসনামলে প্রাচীন বাংলায় শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সনাতন হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল, যা তাঁর পুত্র বল্লাল সেন এবং পৌত্র লক্ষ্মণ সেনের জন্য একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় সাম্রাজ্যের ভিত্তি রেখে গিয়েছিল।