শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান

শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান (যিনি ‘মীর মুগ্ধ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত) (১৯৯৮–২০২৪) ছিলেন ২০২৪ সালের বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম স্মরণীয় এক শহীদ। ১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করা মুগ্ধর এক যমজ ভাই রয়েছেন, যাঁর নাম মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। অত্যন্ত মেধাবী, সদা হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত এই তরুণ ২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ডিসিপ্লিন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। মৃত্যুর সময় তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP)-এ এমবিএ অধ্যয়নরত ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্সার (বিশেষ করে এসইও এবং সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ে), ফুটবলার, স্কাউটস সদস্য এবং ভ্রমণপিপাসু ছিলেন।

১৮ জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা ও “পানি লাগবে, পানি?”

মীর মুগ্ধর আত্মত্যাগের ঘটনাটি বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম হৃদয়বিদারক ও আবেগময় একটি অধ্যায়।

  • মানবিক উদ্যোগ: ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর হামলায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন মুগ্ধ এবং তাঁর বন্ধুরা এক অনন্য মানবিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেন।

  • শেষ মুহূর্ত: মৃত্যুর ঠিক ১৫ মিনিট আগে ধারণ করা একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, টিয়ারগ্যাস ও গোলাগুলির ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও মুগ্ধ এক বাক্স পানির বোতল ও বিস্কুট হাতে নিয়ে আন্দোলনকারীদের মাঝে ছুটে বেড়াচ্ছেন আর অত্যন্ত মায়াবী কণ্ঠে বারবার বলছেন, “ভাই, পানি লাগবে কারও? পানি, পানি?”।

  • হত্যাকাণ্ড: এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই, বিকেল ৫টার দিকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি বুলেট তাঁর কপাল ভেদ করে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে উদ্ধার করে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলেও কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সময়ও তাঁর গলায় বিইউপি-এর আইডি কার্ডটি রক্তমাখা অবস্থায় ঝুলছিল।

আন্দোলনে প্রভাব ও আত্মত্যাগের তাৎপর্য

আবু সাঈদের মতো মীর মুগ্ধর আত্মত্যাগও সাধারণ শিক্ষার্থী ও আপামর জনতার মনে তীব্র ক্ষোভ ও দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং এই আন্দোলনকে একটি চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।

  • প্রতীকী স্লোগান: মুগ্ধর সেই শেষ কথা “পানি লাগবে, পানি?” পুরো আন্দোলনের অন্যতম একটি শক্তিশালী ও আবেগঘন প্রতীকী স্লোগানে পরিণত হয়। দেশজুড়ে অসংখ্য গ্রাফিতি, কবিতা ও শিল্পকর্মে তাঁর এই কথাটি স্থান পেয়েছে।

  • সম্মাননা: তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ মীর মুগ্ধ তোরণ’ রাখা হয়েছে।

উপসংহার

মীর মুগ্ধ ছিলেন সেই প্রজন্মের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি, যাঁরা মেধা, প্রগতিশীল চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও সহযোদ্ধাদের তৃষ্ণা মেটানোর তাঁর যে ব্যাকুলতা, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর মানবিক বীরত্বগাথা হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।