মীর কাসিম (মীর কাসিম আলী খান) বাংলার ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ট্র্যাজিক চরিত্র। তিনি ১৭৬০ থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত বাংলার নবাব ছিলেন। তার শ্বশুর মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলায় যে ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল, মীর কাসিম ছিলেন সেই আধিপত্য ভেঙে বাংলার স্বাধীন সত্তা পুনরুদ্ধারের শেষ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শাসক।
১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীর জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাসিমকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বসায়। ব্রিটিশরা ভেবেছিল মীর কাসিমও তার শ্বশুরের মতো তাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকবেন এবং কোম্পানির কোষাগার পূর্ণ করবেন। কিন্তু মীর কাসিম ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, দূরদর্শী ও দক্ষ প্রশাসক। তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন যে ব্রিটিশদের প্রভাব বলয়ে থেকে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা অসম্ভব। তাই তিনি ব্রিটিশদের নজরদারি থেকে দূরে থাকতে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। সেখানে তিনি তার সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় আদলে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন এবং নিজস্ব বন্দুক ও কামানের কারখানা স্থাপন করেন।
ব্রিটিশদের সাথে মীর কাসিমের দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল ‘দস্তক’ বা বিনা শুল্কে বাণিজ্যের ছাড়পত্রের অবাধ অপব্যবহার। কোম্পানির কর্মকর্তারা কেবল কোম্পানির বাণিজ্যে নয়, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও বেআইনিভাবে এই দস্তক ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে দেশীয় বণিকরা চরম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সর্বস্বান্ত হতে থাকে এবং নবাবের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয়। এর প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর মীর কাসিম এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দেশীয় বণিকদের ওপর থেকেও সমস্ত অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেন, যাতে তারা ব্রিটিশ বণিকদের সাথে সমান সুবিধায় ব্যবসা করতে পারে। নবাবের এই স্বাধীন পদক্ষেপে ব্রিটিশরা মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয় এবং তাদের সাথে নবাবের সরাসরি সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
১৭৬৩ সালে ব্রিটিশদের সাথে মীর কাসিমের একাধিক খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয় (যেমন কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধ)। এসব যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি সিংহাসন হারান এবং অযোধ্যায় আশ্রয় নেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ব্রিটিশদের বাংলা থেকে চিরতরে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে তিনি অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং দুর্বল মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে এক ঐতিহাসিক সামরিক জোট গঠন করেন। ১৭৬৪ সালের ২২শে অক্টোবর এই সম্মিলিত বাহিনী বিহারের বক্সার নামক স্থানে ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়, যা ইতিহাসে বিখ্যাত ‘বক্সারের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত, সামরিক কৌশল ও শৃঙ্খলার অভাবে এই যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই পরাজয় কেবল বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকে পাকাপোক্ত করে দেয়।
বক্সারের যুদ্ধে পরাজয়ের পর মীর কাসিমের জীবন এক চরম ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। তিনি তার সমস্ত সম্পদ, সম্মান ও ক্ষমতা হারিয়ে এক যাযাবর ও ফেরারি জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার শেষ এই স্বাধীনচেতা নবাব ১৭৭৭ সালের কাছাকাছি সময়ে দিল্লির আশেপাশে অত্যন্ত চরম দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও লোকচক্ষুর অন্তরালে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মতো করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মীর জাফর ইতিহাসে যেখানে বিশ্বাসঘাতকতার চরম প্রতীক, মীর কাসিম সেখানে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার শেষ বীরোচিত কিন্তু ব্যর্থ সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নায়ক হিসেবে ইতিহাসে মর্যাদা লাভ করেছেন।