বক্সারের যুদ্ধ

বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম যুগান্তকারী এবং নির্ণায়ক একটি সামরিক সংঘাত। ১৭৬৪ সালের ২২শে অক্টোবর বিহারের বক্সার নামক স্থানে গঙ্গা নদীর তীরে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে একদিকে ছিল মেজর হেক্টর মুনরোর নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং অন্যদিকে ছিল বাংলার ক্ষমতাচ্যুত স্বাধীনচেতা নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং দুর্বল মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বিশাল জোট বাহিনী।

এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল মূলত মীর কাসিমের স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে। ব্রিটিশদের সাহায্যে সিংহাসনে বসলেও মীর কাসিম কোম্পানির বেআইনি বাণিজ্য এবং ‘দস্তক’ (বিনা শুল্কে বাণিজ্যের ছাড়পত্র)-এর অপব্যবহার মেনে নিতে পারেননি। দেশীয় বণিকদের রক্ষার্থে তিনি সকল অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেন, যা ব্রিটিশদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৭৬৩ সালে ব্রিটিশদের সাথে কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে (যেমন- কাটোয়া, গিরিয়া, উদয়নালা) পরাজিত হয়ে মীর কাসিম অযোধ্যায় আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশদের বাংলা থেকে চিরতরে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে অযোধ্যার নবাব ও মুঘল সম্রাটের সাথে এক ঐতিহাসিক সামরিক জোট গঠন করেন।

সম্মিলিত বাহিনীর সেনাসংখ্যা ব্রিটিশ বাহিনীর তুলনায় বহুগুণ বেশি হলেও তাদের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা, অবিশ্বাস ও সামরিক শৃঙ্খলার অভাব ছিল। অন্যদিকে ব্রিটিশ সেনাপতি হেক্টর মুনরোর অধীনে থাকা বাহিনীটি ছিল সংখ্যায় অনেক কম হলেও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, প্রশিক্ষিত এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। বক্সারের প্রান্তরে এই দুই বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষে সম্মিলিত জোট চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে এবং ব্রিটিশ বাহিনীর উন্নত সামরিক রণকৌশল ও কামানের গোলার মুখে টিকতে না পেরে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মীর কাসিম নিরুদ্দেশ হয়ে যান এবং বাকি দুই শাসক (সুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলম) ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে বক্সারের যুদ্ধ ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়লাভ করেছিল মীর জাফরের চক্রান্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছিল নিজেদের প্রকৃত সামরিক শক্তির জোরে। এই জয়ের ফলে ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ এবং মুঘল সম্রাটের মধ্যে বিখ্যাত ‘এলাহাবাদ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ‘দেওয়ানি’ বা রাজস্ব আদায়ের বৈধ অধিকার লাভ করে। এর ফলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা কেবল একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি থেকে একটি সর্বেসর্বা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং প্রায় দুইশো বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হয়।