আফগান যুদ্ধ (Afghan Wars) বলতে মূলত আধুনিক ইতিহাসে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধকে বোঝায়। তবে প্রধানত দুটি যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে:
১. সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯–১৯৮৯) ২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১–২০২১)
এছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও আফগানদের মধ্যে সংঘটিত ‘অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ’-এরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
১. সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯–১৯৮৯)
১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন দিতে সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
-
পটভূমি: আফগানিস্তানে একটি বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইসলামি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো (যারা ‘মুজাহিদিন’ নামে পরিচিত) এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে। এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতেই সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে।
-
স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব: এই যুদ্ধটি ‘কোল্ড ওয়ার’ বা স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং আরও কিছু দেশ সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মুজাহিদিনদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে।
-
ফলাফল: দশ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনী মুজাহিদিনদের গেরিলা আক্রমণের মুখে চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধকে প্রায়শই সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভিয়েতনাম’ বলা হয় এবং এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত।
২. মার্কিন-আফগান যুদ্ধ (২০০১–২০২১)
এটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যা প্রায় ২০ বছর ধরে চলেছিল।
-
পটভূমি ও শুরু: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (9/11) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশ আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আফগানিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ‘তালেবান’-এর কাছে দাবি জানান। তালেবানরা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়।
-
উদ্দেশ্য: প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল আল-কায়েদাকে নির্মূল করা এবং তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করা। দ্রুতই তালেবান সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে আফগানিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ও শক্তিশালী জাতীয় সেনাবাহিনী গঠনের রূপ নেয় (Nation-building)।
-
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত: তালেবানরা ক্ষমতা হারালেও তারা শেষ হয়ে যায়নি। তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে মার্কিন ও আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে।
-
যুদ্ধের সমাপ্তি ও তালেবানের প্রত্যাবর্তন: ২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তালেবানদের সাথে একটি চুক্তি (দোহা চুক্তি) করেন, যার মাধ্যমে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২১ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের চূড়ান্ত পর্যায়ে, আফগান সেনাবাহিনীর দ্রুত পতন ঘটে এবং ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানরা পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে।