ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র (১৮৮৮-১৯৬৯) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর এক অনন্য আধ্যাত্মিক সাধক, সমাজ সংস্কারক এবং চিকিৎসক। পাবনা জেলার হেমায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই মহাপুরুষ কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ও আত্মিক সুস্থতা অপরিহার্য। তাঁর জীবনদর্শন, কর্মপন্থা এবং মানবিক মূল্যবোধ আজ লাখো মানুষের চলার পথের পাথেয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি যে ‘সৎসঙ্গ’ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুকরণীয়।

অনুকূলচন্দ্রের শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল পাবনা ইনস্টিটিউশন ও পরে পশ্চিমবঙ্গের নৈহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে। কলকাতায় ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল থেকে হোমিওপ্যাথি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নিজ গ্রামে ফিরে এসে চিকিৎসা সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু তাঁর চিকিৎসক সত্তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শরীর ও মনের গভীর সংযোগ রয়েছে; মানসিক প্রশান্তি ছাড়া শারীরিক আরোগ্য অসম্ভব। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি মায়ের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করে কীর্তনদল গঠন করেন। কীর্তনের সময় তিনি দিব্যভাবে আবিষ্ট হয়ে যে অমৃত বাণী উচ্চারণ করতেন, তা-ই পরবর্তীতে পুণ্যপুঁথি নামে গ্রন্থিত হয় এবং সেখান থেকেই তিনি ভক্তদের কাছে ‘ঠাকুর’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর এই পরিচয় কেবল নামের জন্য নয়, বরং তাঁর অলৌকিক ধীশক্তি ও মানবপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ ছিল।

মানুষের আত্মিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি পাবনায় গড়ে তোলেন ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’। তাঁর দর্শনের চারটি প্রধান স্তম্ভ হলো, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প এবং সুবিবাহ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যদি আদর্শের পথে চলে, তবে সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুন্দর হয়ে উঠবে। জনকল্যাণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তপোবন বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ছাপাখানা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। তিনি ছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিক গুরু এবং ব্যবহারিক জীবনের একজন সফল সমাজপতি। অনুকূলচন্দ্রের মতে, ধর্ম মানে কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়, ধর্ম হলো জীবনের প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে আত্মিক স্ফূরণ ঘটানো। তিনি কৃষি ও শিল্পকে ধর্মের অংশ হিসেবে দেখেছেন, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল এক চিন্তা।

ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচনার ভাণ্ডার বিশাল এবং বৈচিত্র্যময়। তিনি বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে অনুশ্রুতি (৬ খন্ড), শাশ্বতী (৩ খন্ড) এবং প্রীতিবিনায়ক (২ খন্ড) অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গভীর জ্ঞানগর্ভ। ১৯৪৬ সালে তিনি বিহারের দেওঘরে স্থানান্তরিত হন এবং সেখানেও সৎসঙ্গের নতুন আদর্শপুষ্ট আশ্রম গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি আর ফিরে আসেননি। ১৯৬৯ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি দেহত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও, আজ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর শিষ্যসম্প্রদায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর আদর্শ প্রচার করে যাচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশেই সৎসঙ্গের আশ্রম ও কার্যালয়গুলো মানুষের সেবা ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

পরিশেষে বলা যায়, অনুকূলচন্দ্র ছিলেন একাধারে মানবহিতৈষী, সমাজ সংস্কারক ও ধর্মসাধক। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন কীভাবে জীবনের প্রতিটি কাজকে, তা পড়ালেখা হোক, চাষাবাদ হোক কিংবা শিল্পোৎপাদন, ঈশ্বরের উপাসনার মতো পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তাঁর এই সমন্বিত জীবনদর্শনই তাঁকে যুগ যুগ ধরে প্রাসঙ্গিক করে রাখবে। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আজও বিভ্রান্ত ও দিশেহারা মানুষকে নতুন পথের দিশা দেয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, প্রকৃত সেবা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে বিকশিত করা। অনুকূলচন্দ্রের জীবন ও বাণী কেবল ভক্তদের জন্য নয়, বরং সকল মানুষের জন্য এক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের অন্ধত্ব থেকে আলোর পথে পরিচালিত করে। তাঁর এই আদর্শের চর্চা আজও বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।