অধিচাপ বা ‘ওভারপ্রেশার’ (Overpressure) ভূতাত্ত্বিক এবং খনিজ অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল বিষয়। সহজ কথায়, ভূগর্ভস্থ কোনো শিলাস্তরের ওপর তার স্বাভাবিক hydrostatic চাপের তুলনায় যখন অধিক মাত্রার চাপ প্রযুক্ত হয়, তখন সেই অবস্থাকেই অধিচাপ বলা হয়। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে যখন কোনো প্রবেশ্য শিলাস্তর থাকে, তার ওপর ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত তরল স্তম্ভের একটি ওজন থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই তরল স্তম্ভ, যা সাধারণত পানি বা অন্য কোনো খনিজ তরল হতে পারে—একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ একটি নির্দিষ্ট ও স্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। তবে প্রকৃতি সব সময় এই স্বাভাবিক গাণিতিক ছকে চলে না। যখন শিলাস্তরের গঠন বা তরল প্রবাহের গতির কোনো ব্যতিক্রম ঘটে, তখন স্বাভাবিক চাপের চেয়ে অনেক বেশি চাপের সৃষ্টি হয়, যা ড্রিলিং বা খননকার্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে গভীর কূপ খনন করার সময় প্রায়শই এই অধিচাপের মুখোমুখি হতে হয়। এটি মূলত সেই অঞ্চলের ভূ-গঠনশৈলী বা জিওলজিক্যাল স্ট্রাকচারের একটি বৈশিষ্ট্য। দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে খননকৃত প্রায় প্রতিটি গভীর কূপেই এক পর্যায়ে গিয়ে এই অস্বাভাবিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই অধিচাপ কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি ড্রিলিং কার্যের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কূপ খননকাজকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল, অর্থাৎ বগুড়া বা রাজশাহীর মতো এলাকায় খননকৃত গভীর কূপগুলোতে এ ধরনের কোনো অধিচাপ মণ্ডল (Overpressure zone) পাওয়া যায়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাস এবং গঠনগত বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা।
এই অধিচাপের নেপথ্যে ভূ-বিজ্ঞানীরা প্রধানত ‘ভুবন’ স্তরসমষ্টিকে (Bhuban Formation) দায়ী করেন। ভূতাত্ত্বিক সময়কাল অনুযায়ী মায়োসিন যুগে এই অঞ্চলটি ছিল একটি বদ্বীপীয় বা ডেল্টাইক পরিবেশ। সেই সময় বিপুল পরিমাণ পলি ও কর্দমাক্ত পদার্থ জমা হয়ে বিশাল পুরু শিলাস্তর তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ‘শেল’ (Shale) বা কর্দমশিলা স্তরের আধিক্য এখানে বিদ্যমান। যখন এই কর্দমশিলা স্তরগুলো খুব দ্রুত জমা হয় এবং এর ভেতরে আটকা পড়া তরলগুলো বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না, তখন তারা শিলাস্তরের ওজনের নিচে চাপা পড়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় তরলের ওপর যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, তা আর নিষ্কাশিত হতে পারে না—এটাই মূলত অধিচাপ বা ওভারপ্রেশারের প্রধান কারণ। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, ভুবন ফরমেশনের এই শেল স্তরগুলো অত্যন্ত ঘন ও অভেদ্য হওয়ায় এটি তরল চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, যা চাপের ভারসাম্য নষ্ট করে।
খননকার্যের সময় ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এই অধিচাপ শনাক্ত করা একটি অপরিহার্য কাজ। কারণ, যদি আগে থেকে চাপের মাত্রা বোঝা না যায়, তবে ‘ব্লো-আউট’ বা নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাস/তরল নিঃসরণের মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গভীর কূপ খননের সময় কাদার ঘনত্ব (Mud weight) নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন চাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিতভাবে করতে হয়। বাংলাদেশে খনিজ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে যে সমস্ত কূপ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর জন্য এই অধিচাপের তথ্য সংগ্রহ এবং তার প্রযুক্তিগত মোকাবিলা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা এবং সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থা যেহেতু আরও বেশি জটিল, তাই অধিচাপের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এখানে নিয়মিত গবেষণার বিষয়বস্তু।