বাংলা সঙ্গীত এবং হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে ‘দাদরা’ হলো অন্যতম জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত একটি তাল। এটি মূলত ৬ মাত্রার একটি তাল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর নিয়মের বাইরে হালকা বা লঘু শাস্ত্রীয় (Semi-classical) সঙ্গীতে দাদরা তালের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। অতুলপ্রসাদ সেনের মতো সঙ্গীতজ্ঞরা বাংলা গানের লিরিক বা বাণীর সাথে দাদরা তালের যে চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, তা আজও বাংলা সঙ্গীতকে অনন্য উচ্চতায় ধরে রেখেছে।
দাদরা তালের গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
-
মাত্রা ও বিভাগ: দাদরা তাল ৬ মাত্রার। এটি সাধারণত ৩+৩ অর্থাৎ দুই ভাগে বিভক্ত। এর তালি বা আঘাত পড়ে ১ নম্বর মাত্রায় এবং খালি থাকে ৪ নম্বর মাত্রায়।
-
ছন্দ: দাদরা তালের ছন্দ বেশ সহজ ও সাবলীল। এক, দুই, তিন (তালি)—চার, পাঁচ, ছয় (খালি)—এই সরল গতির কারণে এটি খুব সহজেই সাধারণ শ্রোতার কানে ধরা দেয় এবং মনের মধ্যে এক দোলা সৃষ্টি করে।
-
ব্যবহার: দাদরা তাল প্রধানত ঠুংরি, দাদরা গীতি, গজল, আধুনিক বাংলা গান এবং লোক সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়। এটি গানের ভাবের সাথে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত ছন্দময় পরিবেশ তৈরি করে।
বাংলা গানে দাদরা তালের ভূমিকা:
অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর অনেক গানে দাদরা তালকে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে ব্যবহার করেছেন। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দাদরা ভঙ্গি বা দাদরা ঢঙের গানগুলোতে তিনি বাংলা শব্দের যে বিন্যাস ঘটিয়েছিলেন, তা বাংলা গানে এক নতুন আভিজাত্য যোগ করেছিল।
-
আবেগের প্রকাশ: যেহেতু দাদরা তালের গতি বেশ পরিমিত ও ছন্দময়, তাই বিরহ, প্রেম বা ভক্তি—যেকোনো আবেগের গান গাওয়ার জন্য এটি অত্যন্ত উপযুক্ত। দাদরা তালের তালে তালে গানের কথাগুলো যেন শ্রোতার হৃদয়ে নিবিড়ভাবে গেঁথে যায়। অতুলপ্রসাদের ‘ওগো নিঠুর দরদী’ (মিশ্র আশাবরী-দাদরা) গানটিতে দাদরা তালের ব্যবহার বাংলা সঙ্গীতের এক অবিস্মরণীয় উদাহরণ।
-
পরীক্ষা-নিরীক্ষা: বাংলা গানে দাদরা তালের সাথে ঠুংরি শৈলীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অতুলপ্রসাদ এবং পরবর্তীতে নজরুলের মতো শিল্পীরা দেখিয়েছেন যে, তালের বাঁধন যত সুন্দর ও সাবলীল হয়, গানের বাণী তত বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
কেন দাদরা অনন্য: দাদরা তালের বিশেষত্ব হলো এর নমনীয়তা। ধ্রুপদ বা খেয়াল গায়কির মতো এটি খুব বেশি জটিল নয়, আবার লোক সঙ্গীতের মতো খুব বেশি সরলও নয়। এটি শাস্ত্রীয়তা ও আধুনিকতার মাঝখানের এমন একটি সেতু, যা শ্রোতাকে গানে মগ্ন করে রাখে। অতুলপ্রসাদ সেন যখন তাঁর গানে দাদরা তালের প্রয়োগ করেন, তখন তিনি কেবল তাল রক্ষা করেননি, বরং তালকে গানের ছন্দের সাথে মিশিয়ে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন। দাদরা তালের ছন্দের মূর্ছনায় বাংলা গান যেন এক নতুন প্রাণ ফিরে পায়।