ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ওলন্দাজ ভাষায়: Vereenigde Oostindische Compagnie বা VOC) ছিল একটি ঐতিহাসিক ডাচ যৌথ মূলধনী কোম্পানি, যা ১৬০২ সালের ২০ মার্চ নেদারল্যান্ডসের (হল্যান্ড) সরকার বা ডাচ প্রজাতন্ত্রের সনদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ইতিহাসের সর্বপ্রথম বহুজাতিক কর্পোরেশন (Multinational Corporation) এবং বিশ্বের প্রথম কোম্পানি যারা সাধারণ জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ার বা স্টক বিক্রি করেছিল। এশিয়ায় মশলার একচেটিয়া বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কয়েকটি ছোট ছোট ডাচ বাণিজ্য সংস্থাকে একত্রিত করে এই বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়, যা পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রবল আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য ও বিস্তার প্রতিষ্ঠার পর কোম্পানিটি দ্রুত এশিয়ার সমুদ্রপথে পর্তুগিজদের আধিপত্য খর্ব করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের বাটাভিয়ায় (বর্তমান জাকার্তা) তারা তাদের এশীয় সদর দপ্তর স্থাপন করে। মশলা, বিশেষ করে লবঙ্গ, জায়ফল এবং দারুচিনির বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা (সিলন), জাপান, মালয়েশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বিশাল বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ও দুর্গ গড়ে ওঠে। নিছক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও নিজস্ব সেনাবাহিনী, যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা, নিজেদের মুদ্রা তৈরি এবং অন্যান্য দেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা বা চুক্তি করার মতো সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও এই কোম্পানির ছিল।
বাংলা ও ভারতবর্ষে অবস্থান ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে সুবে বাংলায় ওলন্দাজরা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রবেশ করে। ভারতের করোমন্ডল উপকূল, সুরাট ও কোচিনের পাশাপাশি বাংলায় তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবস্থান ছিল। ১৬৩৫ সালে তারা হুগলির চুঁচুড়ায় (Chinsurah) তাদের প্রধান বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে, যা বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ ইউরোপীয় উপনিবেশে পরিণত হয়। বাংলা থেকে তারা মূলত সুতিবস্ত্র, কাঁচা রেশম, আফিম এবং সল্টপেটার (বারুদ তৈরির উপাদান) ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য অংশে রপ্তানি করত। তবে বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব বাড়তে থাকলে ১৭৫৯ সালে ঐতিহাসিক বিদারার যুদ্ধে (Battle of Biderra বা চুঁচুড়ার যুদ্ধ) ওলন্দাজ বাহিনী রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে চরমভাবে পরাজিত হয়। এই পরাজয় ভারতবর্ষে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত পতন ডেকে আনে।
পতন ও অবলুপ্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এই বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয়। কোম্পানির ভেতরে ব্যাপক দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, ব্রিটিশদের সাথে একাধিক নৌযুদ্ধে পরাজয় (বিশেষ করে চতুর্থ ইঙ্গ-ডাচ যুদ্ধ) এবং চোরাচালানের কারণে কোম্পানিটি আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। ঋণের ভারে জর্জরিত ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে শেষ পর্যন্ত ডাচ সরকার ১৭৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন উপনিবেশ ও সম্পদগুলো সরাসরি ডাচ সরকারের অধীনে চলে যায়, যা পরবর্তীতে ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ’ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) নামে পরিচিতি লাভ করে।