পুঁজিবাদী এবং আধুনিক মিশ্র অর্থনীতিতে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগী বা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (NBFI) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘লিজিং’ বা ইজারা ব্যবসা বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় এবং কার্যকর অর্থায়ন পদ্ধতি। লিজিং হলো এমন একটি আইনি ও আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো সম্পদের মালিক (ইজারাদাতা বা Lessor) একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপর একটি পক্ষকে (ইজারাদার বা Lessee) চুক্তির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে সেই সম্পদ ব্যবহারের অধিকার প্রদান করে [অর্থনীতি ও আধুনিক অর্থায়ন বিশ্বকোষ, প্রকাশনা-২০১০]। বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে লিজিং ব্যবসা অপেক্ষাকৃতভাবে একটি নতুন ঘটনা হলেও, দেশের শিল্পায়ন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বিকাশে এটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। সমাজের যেসব শ্রেণি বা উদ্যোক্তা সহজে গতানুগতিক ব্যাংক ঋণের সুবিধা পায় না, এই মধ্যস্বত্বভোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আর্থিক প্রয়োজনীয়তা মেটাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে থাকে।
বাংলাদেশে লিজিং ব্যবসার উৎপত্তি ও প্রাথমিক বিকাশ
বাংলাদেশে লিজিং ব্যবসার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯৮৫ সালে। সে বছর ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট লিজিং কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড’ বা সংক্ষেপে আইডিএলসি (IDLC)-এর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই মূলত দেশে প্রথম লিজিং কোম্পানির আত্মপ্রকাশ ঘটে [আইডিএলসি বার্ষিক প্রতিবেদন, ১৯৮৬]। এটি কোনো একক উদ্যোগ ছিল না; বরং একটি শক্তিশালী যৌথ উদ্যোগ হিসেবে এই কোম্পানি গঠিত হয়েছিল। এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিল কোরিয়ান ডেভেলপমেন্ট লিজিং কর্পোরেশন (কেডিএলসি), বিশ্বব্যাংকের একটি বেসরকারি শাখা হিসেবে পরিচিত ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি), এবং অন্যান্য স্বনামধন্য দেশি-বিদেশি সংস্থা। শুরুতে একটি অ-আমানতী সংগঠন হিসেবে এটি তার কার্যক্রম শুরু করে।
লিজিং ব্যবসার প্রকৃতি সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। লিজিং কোম্পানির জটিল হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, সম্পদের মালিকানা ও কর প্রদান সংক্রান্ত জটিল বৈশিষ্ট্য এবং সে সময়ে বাংলাদেশে কোনো স্থানীয় লিজিং বিশেষজ্ঞ না পাওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবস্থাপনায় বিদেশি জনবলের শরণাপন্ন হতে হয়। এই শূন্যতা পূরণের জন্য মি. জে. ডি. লি (J.D. Lee) নামক একজন প্রথিতযশা কোরিয়ান লিজিং বিশেষজ্ঞকে আইডিএলসি’র প্রথম প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মি. জে. ডি. লি তাঁর অসামান্য দক্ষতা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে লিজিং ব্যবসার একটি সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন [বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ইতিহাস, ২০০৫]। সময়ের পরিক্রমায় এই খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বর্তমানে দেশে কার্যকর ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (Financial Institutions) রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কাঠামোগত দিক থেকে একটি সরকারি মালিকানাধীন, ১৫টি সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্যোগে, ১১টি বিদেশি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যৌথ উদ্যোগে এবং ২টি গৃহনির্মাণ ফিন্যান্স কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে।
এসএমই (SME) খাতের উন্নয়নে লিজিং-এর অপরিহার্য ভূমিকা
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এসএমই (SME) খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সমাজের যেসব শ্রেণি সমমূলধন (Equity) আকারে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ (Cash Margin) সংরক্ষণ করতে পারে না এবং ঋণ নেওয়ার জন্য ব্যাংকের চাহিদামতো পর্যাপ্ত স্থাবর জামানত (Collateral) দিতে ব্যর্থ হয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে স্বস্তিবোধ করে না। এর মূল কারণ হলো, ব্যাংক সবসময় তাদের প্রদত্ত ঋণের আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ আইনি ও বস্তুগত নিশ্চয়তা চায়। পক্ষান্তরে, লিজিং কোম্পানিগুলোর ঋণ প্রদানের দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা ঋণ আদায়ের জন্য জামানত ও সমমূলধনের পরিবর্তে একজন উদ্যোক্তার ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, প্রজেক্টের উপযোগিতা এবং নগদ অর্থ প্রবাহের (Cash Flow) ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করে [এসএমই ফাউন্ডেশন, ক্ষুদ্র ঋণ মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ২০০৮]।
এসব কারণে দেখা গেছে যে, লিজিং কোম্পানিগুলো এসএমই খাতে অত্যন্ত দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং এ ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংকগুলো অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমানে সমগ্র দেশে এসএমই খাতে লিজিং কোম্পানিগুলোর প্রায় ৬০ লক্ষের মতো বিশাল গ্রাহক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লিজিং কোম্পানিগুলোর সংগৃহীত মোট অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশই এসএমই খাতে বিনিয়োগ বা ব্যয় করা হয়, যা জাতীয় আয়ে বা জিডিপি-র (GDP) ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ শতাংশের মতো বিশাল অবদান রাখে [অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০০৯]। বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেট জায়ান্টদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সনি, স্যামসাং, বা মাইক্রোসফটের মতো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে অতি ক্ষুদ্র বা এসএমই প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ব্যবসা শুরু করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৬ সালে জাপানের সনি মাত্র ২০ জন কর্মচারী নিয়ে, ১৯৬৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং মাত্র ৪০ জন কর্মচারী নিয়ে এবং ১৯৭৫ সালে আমেরিকার মাইক্রোসফট মাত্র ২ জন কর্মচারী নিয়ে তাদের অসামান্য ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেছিল [গ্লোবাল কর্পোরেট হিস্ট্রি জার্নাল, ২০০২]। লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক এই সম্ভাবনাময় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই মূলধন ও যন্ত্রপাতির জোগান দিয়ে বড় হতে সাহায্য করে।
আইনি কাঠামো, আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান মানদণ্ড ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
লিজিং কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে মূলত সকল প্রকার ঝুঁকি গ্রহণের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান করে। যদি ইজারাদার চুক্তিবদ্ধ শর্তানুযায়ী কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূলধন ও মুনাফা সঠিকভাবে ফেরত দেয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই মূল মালিককে পুরস্কৃত করা হয় বা নামমাত্র মূল্যে সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। এরূপ আর্থিক সহায়তা পদ্ধতির অধীনে ‘লিজ চুক্তি আইন’-এর মাধ্যমে যদি গ্রাহক বা ইজারাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোম্পানিকে (ইজারাদাতাকে) কোনো কারণে কিস্তি বা ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি ঋণ প্রদানকৃত সম্পদের মালিকানার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে পাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঋণ প্রদানকৃত সম্পদের পুনরাধিকার লাভের জন্য অনেক সময়ই সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে নানাবিধ আইনগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়, যা লিজিং ব্যবসার জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা [বাংলাদেশ আইন কমিশন, চুক্তি আইন পর্যালোচনা, ২০০১]।
হিসাবরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ বা আইএএস ১৭ (IAS 17) লিজিং ব্যবসার জন্য একটি বিশ্বজনীন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। আইএএস ১৭-এর নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণ প্রদানকৃত অর্থ বা লিজকে এমন একটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে যেখানে লিজিং কোম্পানি (ইজারাদাতা) চুক্তির মেয়াদ শেষে গ্রাহককে (ইজারাদার) সম্পদের চূড়ান্ত মালিকানা হস্তান্তর করুক বা নাই-ই করুক, ইজারাদার ক্ষেত্রবিশেষে ওই সম্পদের ব্যবহারের যাবতীয় সকল প্রকার ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক পুরস্কার লাভের অধিকারী হবেন [আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান মানদণ্ড বোর্ড (IASB), IAS 17]। আর্থিক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পদের জন্য মূলধন খাতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারের জন্য কোম্পানিকে সেই পরিমাণ পাওনা এমনভাবে নির্ধারণ করে পরিশোধ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগের ওপর ব্যয়িত মূল অর্থ এবং তার আনুষঙ্গিক মুনাফা সম্পূর্ণরূপে ফেরত আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কয়েক বছর লিজিং কোম্পানিগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ছিল না। ১৯৯৩ সালে ‘নন-ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন আইন’ (NBFI Act) এবং ১৯৯৪ সালে ‘ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস রেগুলেশন’ পাশ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লিজিং কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এই খাতটির ক্রমবর্ধমান প্রসার ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব অনুধাবন করে, লিজিং কোম্পানিগুলোর সার্বিক তদারকি ও কার্যাবলি নিখুঁতভাবে তত্ত্বাবধানের জন্য সরকার প্রথম আইন প্রণয়নের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তাদের কার্যাবলির অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা আনার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন’ (FI) বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
আইন পাসের পর, পূর্বে প্রদত্ত সকল লিজিং কোম্পানিগুলোকে তাদের পূর্বের দেওয়া অনুমতিপত্র বা লাইসেন্স বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন শর্তে লাইসেন্স গ্রহণ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দাপ্তরিকভাবে এসব লিজিং কোম্পানির নামকরণ করে এনবিএফআই বা এফআই (NBFI/FI)। এর পর থেকেই মূলত সনাতন লিজিং কোম্পানিগুলো তাদের আগের একক ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে বৃহত্তর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হয় [বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিএফআই প্রবিধানমালা, ১৯৯৪]।
ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর আর্থিক ভিত্তি এবং মূলধন কাঠামোকে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সালের ২৯ জুন একটি যুগান্তকারী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এই নির্দেশনায় বলা হয় যে, সকল আর্থিক কোম্পানিকে তাদের পরিশোধিত মূলধনের (Paid-up Capital) পরিমাণ বাংলাদেশের টাকায় কমপক্ষে ২৫০ মিলিয়ন (২৫ কোটি টাকা)-এ উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (IPO) ইস্যু করার মাধ্যমে শেয়ার বাজারে (Stock Market) আবশ্যিকভাবে তালিকাভুক্ত হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কঠোর নির্দেশের ফলে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের প্রায় সকল কোম্পানি পুঁজি বা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়, যা দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে [বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বুলেটিন, ২০০৪]। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধান, নিয়মিত নজরদারি, ব্যাপক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং নীতি নির্ধারণী পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে এসব ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের কার্যাবলি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে।
তহবিল সংগ্রহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং আমানত বৈচিত্র্যকরণ
১৯৯৩ সালের এনবিএফআই (NBFI) আইনের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই আইনের মাধ্যমে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোকে সরাসরি জনসাধারণ, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অন্যান্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে মেয়াদি আমানত (Term Deposit) গ্রহণের ঐতিহাসিক অনুমতি প্রদান করা হয়। এর ফলে বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন তাদের সংগৃহীত আমানত পুঁজি থেকে তাদের দৈনন্দিন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত চলতি তহবিলের প্রায় ৫৫ শতাংশ চাহিদা সহজেই সম্পূরণ করতে পারে। এই যুগান্তকারী ব্যবস্থা তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতা অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকের মধ্যভাগে এই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর্থিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর নিয়ম অনুযায়ী, তারা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পূর্বানুমতি সাপেক্ষে বন্ড ইস্যু, নিজস্ব সম্পদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান, বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দাতা তহবিল থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করে তাদের চলতি তহবিলের কাজ অত্যন্ত সাবলীলভাবে চালিয়ে যেতে পারে।
তবে, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বা প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তাদের তহবিল ব্যয় (Cost of Funds) এবং স্বল্প মূল্যের তহবিলের চরম স্বল্পতা। সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৭ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ তহবিল ব্যয়ের বিপরীতে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ; যা গড় হিসাব করলে দাঁড়ায় ১২.৫ শতাংশ থেকে ১৩.৫ শতাংশ [বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০০৬]। এর কারণ হলো, ব্যাংকগুলো জনগণের কাছ থেকে সুদমুক্ত বা চলতি হিসাবের আমানত (Demand Deposit) এবং স্বল্প ব্যয় সম্বলিত সঞ্চয়ী আমানত (Savings Deposit) গ্রহণ করতে পারে, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পারে না। ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ব্যতীত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ জনগণের নিকট থেকে নিয়মানুযায়ী সাধারণত কমপক্ষে এক বছর বা তদূর্ধ্ব সময়ের জন্য মেয়াদি আমানত গ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো এবং বিভিন্ন নিগমবদ্ধ সংস্থা বা কর্পোরেট বডিগুলো ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ মাসের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক মেয়াদি আমানত গ্রহণ করতে পারে। অবশ্য তারল্য সংকট মেটানোর জন্য ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে আন্তঃব্যাংক তলবি অর্থ বাজার (Call-money Market) থেকে তাদের প্রকৃত মূলধনের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ পায়।
তহবিল ব্যয় বেশি হওয়ায় ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চলতি তহবিলকে শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নগদ অর্থের ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের উদ্দেশ্যে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে অভিনব ও বিভিন্ন প্রকার আমানতী ও সেবা প্রদান সুযোগ-সুবিধার প্রচলন করছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুদের হার ও অর্থ বিনিয়োগের স্কিম; যেমন—মাসিক ভিত্তিতে সুদ প্রদান, মেয়াদপূর্তির পূর্বেই অগ্রিম সুদ প্রদান, এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে জমানো অর্থ দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে প্রদান ইত্যাদি। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সাধারণ ব্যাংকের তুলনায় তাদের প্রস্তাবিত সুদের হারের পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়ে থাকে। নিজস্ব উৎসব্যবস্থা থেকে এসব সুযোগ-সুবিধা প্রদান তাদের সাময়িক চলতি তহবিল সংকট কিছুটা দূর করে এবং আমানতের গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে—এটি সত্য। কিন্তু এর নেতিবাচক দিক হলো, এতে সামগ্রিকভাবে তাদের তহবিল ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্বভাবতই ঋণের ওপর সুদের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এরূপ উচ্চ সুদের হার প্রদানে অসমর্থ দেশের একটি বিরাট সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকের নিকট তাদের ঋণ সেবা প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিনিয়োগের প্রধান খাতসমূহ ও সরকারি নীতির প্রভাব
দেশের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান আর্থিক বিনিয়োগের খাতগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বিস্তৃত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হচ্ছে: বস্ত্রশিল্প, তৈরি পোশাক শিল্প ও এর আনুষঙ্গিক উপকরণ, সড়ক ও সামুদ্রিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা, ঔষধ তৈরি ও রাসায়নিক সামগ্রী উৎপাদন, লোহা ও হালকা প্রকৌশলী কারখানাসহ ভারী স্টিল ও প্রকৌশল শিল্প, ট্রাক্টর, ট্রেইলর ও পাওয়ার টিলারসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক শিল্প ও আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি খাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি (IT), তথ্য ও কম্পিউটার প্রযুক্তি সরঞ্জাম, প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং শিল্প, ভূ-সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট ও গৃহনির্মাণ খাত, খাদ্য ও পানীয় শিল্প, বিভিন্ন সেবাখাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ইত্যাদি [বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, শিল্প খাত জরিপ, ২০০৭]।
উচ্চ তহবিল ব্যয়ের উপর্যুক্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট জোর দাবি জানিয়ে আসছে যে, তাদের তহবিল ব্যয় হ্রাসকরণের জন্য যেন স্বল্পমূল্যের ‘জন-অর্থায়ন শাখা’ খোলার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী ভূমিকা পালন করতে পারে। ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর এই যৌক্তিক সমস্যা অনুধাবন করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং স্কিমে এদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে এরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসএমই ফাইন্যান্সিং স্কিম’ (SME Financing Scheme), ‘লো-কস্ট স্পেশাল ইউজিং ফিন্যান্স স্কিম’, ‘অ্যাগ্রো বেইসড ইন্ডাস্ট্রিজ ফিন্যান্সিং স্কিম’ ইত্যাদির সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ, বর্তমানে তারা ব্যাংকগুলোর মতোই বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন শাখার অধীনে কাজ করে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারছে। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হচ্ছে, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের খেলাপি ঋণের বা অ-নিষ্পন্ন অগ্রিমের (NPO – Non-Performing Outstanding) হার ২০০৮-২০০৯ সাল ব্যতীত বিগত কয়েক বছরে ৫ শতাংশের মতো একটি সহনশীল মাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০৮-২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী যে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা (Global Financial Crisis) দেখা দিয়েছিল, শুধুমাত্র সে কারণেই খেলাপি ঋণ আদায়ের এই হার সাময়িকভাবে কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল [বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, ২০০৯]।
নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
লিজিং খাতের বিকাশে সরকারের কিছু কর ও শুল্ক নীতি মাঝেমধ্যেই বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সরকার ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের (Income Tax Ordinance, 1984) ৩৬ নং ধারার তৃতীয় তফসিল সংশোধন করে। এই আকস্মিক সংশোধনীর ফলে জন্মলগ্ন থেকে বিগত ২০ বছর ধরে লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলো যে ‘অবচয় সঞ্চিতি/ভাতা/অধিদেয়’ (Depreciation Allowance) লাভ করে আসছিল, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। হিসাববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, অবচয় সঞ্চিতি ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড ১৭’-এর একটি সর্বজনস্বীকৃত ও অপরিহার্য অংশ, যা লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর রেয়াত পেতে সাহায্য করত। তাই এই অবচয় সঞ্চিতি প্রত্যাহারের ফলে লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক আইনি ও আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং এর ফলে লিজিং-এর মূল আকর্ষণ হারিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শুধুমাত্র একটি সাধারণ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে বাধ্য হয় [জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাজেট পর্যালোচনা, ২০০৭-০৮]।
এছাড়া, শুধুমাত্র একটি আর্থিক দিক নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও লিজিং কোম্পানিগুলো তাদের সূচনালগ্নে প্রাথমিকভাবে ৫ বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ কর অব্যাহতি বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ (Tax Holiday) সুবিধা ভোগ করত। কিন্তু দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার এই কর অব্যাহতি সুবিধাও ২০০১ সালে তুলে নেওয়া হয়, যা এই খাতের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল।
এতসব নীতিগত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো দেশের অর্থনীতিতে তাদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে স্বল্প মেয়াদি ঋণ, মধ্য মেয়াদি ঋণ, দীর্ঘ মেয়াদি শিল্প ঋণ এবং সাধারণ গৃহনির্মাণ ঋণ ইত্যাদি ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের মোট আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। তাদের আর্থিক প্রবৃদ্ধির সূচকগুলোও বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই খাতের মোট অর্থের বা পুঁজির পরিমাণ ছিল বাংলাদেশের মুদ্রায় ৮৬.৯ বিলিয়ন (৮,৬৯০ কোটি) টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের মোট পুঁজির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০৯.৫ বিলিয়ন (১০,৯৫০ কোটি) টাকায়। শতকরা হিসেবে পরিমাপ করলে দেখা যায়, সমগ্র দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে লিজিং বা এনবিএফআই খাতের একার ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ শতাংশ, যা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি অর্জন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নানাবিধ আইনি জটিলতা, উচ্চ তহবিল ব্যয় এবং কর সংক্রান্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে লিজিং কোম্পানি বা ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে এসএমই খাতের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঠিক তদারকি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই খাতটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বহুগুণ বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে।