অবলিখন

আর্থিক এবং ব্যবসায়িক পরিভাষায় ‘অবলিখন’ (Underwriting) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট ফির (কমিশন বা প্রিমিয়াম) বিনিময়ে অন্য কোনো পক্ষের আর্থিক ঝুঁকি গ্রহণ করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকি গ্রহণ করে এবং গ্যারান্টি দেয়, তাকে ‘অবলিখক’ (Underwriter) বলা হয়।

সহজ কথায়, অবলিখন হলো আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদানের একটি আইনি চুক্তি। এটি মূলত শেয়ার বাজার, বীমা খাত এবং ব্যাংকিং খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

অবলিখনের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ

আর্থিক খাতে মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে অবলিখনের কাজ হয়ে থাকে:

১. শেয়ার বা সিকিউরিটিজ অবলিখন (Securities Underwriting)

শেয়ার বাজারে অবলিখনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ দেখা যায়। যখন কোনো কোম্পানি শেয়ার বাজারে প্রথমবারের মতো নতুন শেয়ার বা আইপিও (IPO – Initial Public Offering) ছাড়ে, তখন তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্য থাকে। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যদি সব শেয়ার না কেনে, তবে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

  • অবলিখকের কাজ: এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কোম্পানি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা মার্চেন্ট ব্যাংকের (অবলিখক) সাথে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, সাধারণ জনগণ যদি সব শেয়ার না কেনে, তবে অবিক্রীত বাকি শেয়ারগুলো অবলিখক নিজেই কিনে নিতে বাধ্য থাকে। এর বিনিময়ে কোম্পানি অবলিখককে একটি নির্দিষ্ট হারে ‘আন্ডাররাইটিং কমিশন’ বা অবলিখন ফি প্রদান করে।

২. বীমা অবলিখন (Insurance Underwriting)

বীমা বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে অবলিখন একটি দৈনন্দিন ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তির জীবন বীমা, স্বাস্থ্য বীমা বা সম্পদের বীমা (যেমন: গাড়ির বা কারখানার বীমা) করার আগে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

  • অবলিখকের কাজ: বীমা অবলিখক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করেন যে আবেদনকারীকে বীমা সুবিধা দিলে কোম্পানির ঝুঁকি কতটা। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে অবলিখক ব্যক্তির বয়স, পূর্বের রোগব্যাধি বা পেশাগত ঝুঁকি যাচাই করেন। এই ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করেই অবলিখক নির্ধারণ করেন আবেদনকারীর ‘প্রিমিয়াম’ (বীমার নিয়মিত কিস্তি) কত হবে। ঝুঁকি অতিরিক্ত মনে হলে অবলিখক বীমার আবেদন প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন।

৩. ঋণ বা ব্যাংক অবলিখন (Loan Underwriting)

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যখন কেউ বড় অঙ্কের ঋণ বা মর্টগেজ (Mortgage – স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ) নিতে যান, তখন ব্যাংক এই অবলিখন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

  • অবলিখকের কাজ: ব্যাংকের অবলিখক ঋণগ্রহীতার আয়ের উৎস, সম্পদের পরিমাণ এবং ‘ক্রেডিট হিস্ট্রি’ (অতীতের ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের রেকর্ড) গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো এটি নিশ্চিত করা যে, ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য রয়েছে এবং ব্যাংক কোনো বড় খেলাপির ঝুঁকিতে পড়বে না।

অবলিখন প্রক্রিয়ার মূল ধাপ

অবলিখন প্রক্রিয়াটি সাধারণত তিনটি মূল ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়:

  1. ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment): আবেদনকারী বা কোম্পানির যাবতীয় আর্থিক তথ্য, ইতিহাস এবং বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা নির্ণয় করা।

  2. মূল্য নির্ধারণ (Pricing): ঝুঁকির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে সঠিক ফি, কমিশন, ঋণের সুদ বা বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা। ঝুঁকি বেশি হলে চার্জও বেশি হয়।

  3. সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision Making): চূড়ান্তভাবে ঝুঁকি গ্রহণের চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে কি না, নাকি আবেদনটি বাতিল করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব

  • মূলধন সংগ্রহে নিশ্চয়তা: শেয়ার বাজারে নতুন কোম্পানিগুলোকে নির্বিঘ্নে মূলধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করে, যা দেশের শিল্পায়নে ভূমিকা রাখে।

  • আর্থিক খাতের সুরক্ষা: ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোকে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

  • বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: বড় কোনো ব্যাংক যখন কোনো কোম্পানির শেয়ারের অবলিখন করে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে সেই কোম্পানির প্রতি আস্থা তৈরি হয়।