আরাকান

আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন রাজ্য) হলো মিয়ানমারের (সাবেক বার্মা) পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন ঐতিহাসিক অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটির উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সীমান্ত অবস্থিত। সুউচ্চ ‘আরাকান ইয়োমা’ বা রাখাইন পর্বতমালা এই অঞ্চলটিকে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই প্রাকৃতিক বিভাজনের কারণেই আরাকানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনমিতি মিয়ানমারের অন্যান্য অংশের চেয়ে অনেকাংশেই স্বতন্ত্র এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন বাংলার সাথে এর অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক ছিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও ম্রক-উ সাম্রাজ্য আরাকান দীর্ঘকাল ধরে একটি স্বাধীন ও পরাক্রমশালী রাজ্য হিসেবে টিকে ছিল। ১৪২৯ সালে রাজা মেং সোয়ামুন (যিনি বাংলার সুলতানের সহায়তায় ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন) বিখ্যাত ‘ম্রক-উ’ (Mrauk U) রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এই ম্রক-উ সাম্রাজ্য ছিল আরাকানের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে আরাকান একটি শক্তিশালী নৌ-সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং একপর্যায়ে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বেশ কিছু অংশ তাদের অধীনে ছিল। আরাকান রাজদরবারে বৌদ্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব ও অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছিল, যেখানে বৌদ্ধ রাজারা অনেক সময় মুসলিম উপাধি গ্রহণ করতেন এবং তাদের মুদ্রায় ফারসি ও আরবি লিপির ব্যবহার দেখা যেত।

রোসাঙ্গ রাজদরবার ও বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আরাকান বা ‘রোসাঙ্গ’ রাজদরবারের অবদান অবিস্মরণীয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানের রাজারা এবং সেখানকার মুসলিম অমাত্যরা (যেমন: মাগন ঠাকুর, আশরাফ খান) বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এই রাজদরবারের আশ্রয়ে থেকেই মহাকবি আলাওল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘পদ্মাবতী’ রচনা করেন এবং দৌলত কাজী ‘সতী ময়না ও লোরচন্দ্রানী’-এর মতো কালজয়ী কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।

পতন, ব্রিটিশ শাসন ও কক্সবাজারে প্রভাব সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানের ‘মগ’ এবং পর্তুগিজ জলদস্যুরা (হার্মাদ) বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক লুটতরাজ ও ত্রাস সৃষ্টি করত। ১৬৬৬ সালে বাংলার মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খান এক সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম উদ্ধার করেন, যা আরাকান রাজ্যের পতনের সূচনা করে। পরবর্তীতে ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান আক্রমণ করে এটি দখল করে নেন। বার্মিজদের এই চরম নিপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার আরাকানি ও রাখাইন শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে ব্রিটিশ শাসিত বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে (বর্তমান কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম) আশ্রয় নেয় (যাদের পুনর্বাসনের জন্যই ব্রিটিশ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স কাজ করেছিলেন)। পরবর্তীতে ১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধের পর ‘ইয়ান্দাবো চুক্তি’র মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আরাকানকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে।