চট্টগ্রাম বিভাগ

চট্টগ্রাম বিভাগ হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম প্রশাসনিক বিভাগ। ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিভাগ, যার মোট আয়তন প্রায় ৩৩,৯০৮ বর্গকিলোমিটার। এই বিভাগের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্য এবং ঢাকা ও সিলেট বিভাগ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য এবং মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন (আরাকান) রাজ্য, এবং পশ্চিমে বরিশাল বিভাগ ও মেঘনা নদীর মোহনা অবস্থিত। সুউচ্চ পর্বতমালা, চিরসবুজ বনাঞ্চল, পাহাড়ি উপত্যকা, বিস্তৃত সমভূমি এবং দীর্ঘ বালুকাময় উপকূলরেখা মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ভূ-প্রকৃতি দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনন্য ও বৈচিত্র্যময়।

প্রশাসনিক কাঠামো ও জেলাসমূহ

চট্টগ্রাম বিভাগ মোট ১১টি জেলা নিয়ে গঠিত, যা দুটি ভিন্ন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত:

  • সমতল ও উপকূলীয় জেলাসমূহ: চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং লক্ষ্মীপুর।

  • পার্বত্য জেলাসমূহ (পার্বত্য চট্টগ্রাম): রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি।

বিভাগের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র ও কমিশনারের কার্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে অবস্থিত। পার্বত্য তিনটি জেলা তাদের প্রথাগত সার্কেল ব্যবস্থা (চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেল) এবং বিশেষ আঞ্চলিক পরিষদের কাঠামোর মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ধারা বজায় রেখে পরিচালিত হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রাচীন ঐতিহ্য

ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভৌগোলিকদের মানচিত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায় এবং মধ্যযুগে আরব, পারস্য ও পর্তুগিজ বণিকদের কাছে এই বন্দর ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এটি বিভিন্ন সময়ে মৌর্য, গুপ্ত, হরিকেল ও আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীতে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের মাধ্যমে এটি বাংলার সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে ১৬৬৬ সালে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খান আরাকানিদের হাত থেকে চট্টগ্রাম পুনর্দখল করে এর নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামেও চট্টগ্রাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, যার মধ্যে ১৯৩০ সালের মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অবিস্মরণীয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাসহ এই বিভাগের প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল জাতির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

অর্থনীতি, বন্দর ও শিল্পায়ন

চট্টগ্রাম বিভাগকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বা লাইফলাইন হিসেবে গণ্য করা হয়:

  • চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় নব্বই শতাংশই এই প্রধান সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।

  • ভারী শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল: জাহাজ ভাঙা শিল্প (সীতাকুণ্ড), তেল শোধনাগার (ইস্টার্ন রিফাইনারি), ইস্পাত কারখানা, সার কারখানা এবং দেশের প্রাচীনতম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড ও কেইপিজেড) এই বিভাগে কেন্দ্রীভূত। পাশাপাশি মীরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’ গড়ে উঠছে।

  • জ্বালানি ও মেগা প্রকল্প: মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্র বন্দর এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ভূগর্ভস্থ টানেল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষি

প্রাকৃতিক সম্পদে চট্টগ্রাম বিভাগ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কর্ণফুলী, হালদা (দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন নদী), সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মেঘনা ও বাঁকখালী নদী এই অঞ্চলকে সজীব রেখেছে। কাপ্তাই হ্রদ দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎস। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) ঘিরে রয়েছে অপার মৎস্য সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং উপকূলীয় ভারী খনিজ বালুর সঞ্চয়। পাহাড়ি অঞ্চলে রাবার চাষ, বনজ সম্পদ, বাঁশ, চা বাগান এবং পাহাড়ি ফলের বাগান জাতীয় উৎপাদনে বিশাল অবদান রাখে।

জনমিতি, সংস্কৃতি ও পর্যটন

বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাস করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, রাখাইন, বম, খুমি, পাংখোয়া ও চাকসহ বহু প্রাচীন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এই জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার সংস্কৃতি, ভাষা ও উৎসব অত্যন্ত বর্ণিল। ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যের ক্ষেত্রে চাটগাঁইয়া উপভাষা সমগ্র দেশে বিশেষভাবে পরিচিত। পর্যটনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভাগ। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি হ্রদের শহর রাঙ্গামাটি, মেঘ-পাহাড়ের মিলনস্থল বান্দরবানের নীলগিরি ও নীলাচল এবং খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি এই বিভাগকে দেশের প্রধানতম ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে। সব মিলিয়ে কৌশলগত ভূ-অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম বিভাগ বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও অগ্রযাত্রার এক অপরিহার্য স্তম্ভ।