শায়েস্তা খান (১৬০৬–১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন মোগল আমলের বাংলার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী সুবাদার। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তিনি দুই দফায় মোট প্রায় ২৪ বছর (১৬৬৪–১৬৭৮ এবং ১৬৮০–১৬৮৮) বাংলাকে শাসন করেন। তাঁর শাসনকাল কেবল মোগল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য ইতিহাসে স্বর্ণযুগের মতো বিবেচিত হয়। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল’)
পারিবারিক পরিচয় ও ক্ষমতার উত্থান
শায়েস্তা খান ছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের আপন ভাই এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাই আসাফ খানের পুত্র। রাজকীয় পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় তিনি মোগল দরবারে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি আওরঙ্গজেবের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যের সুবাদার হিসেবে সামরিক দক্ষতা দেখানোর পর সম্রাট তাঁকে বাংলার দায়িত্ব প্রদান করেন। (উৎস: বাংলাপিডিয়া)
চট্টগ্রাম বিজয় ও মগ দস্যুদের দমন
শায়েস্তা খানের শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য ছিল ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিজয়। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম ছিল আরাকানি মগ এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র, যারা বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে লুটতরাজ ও দাস ব্যবসা চালাত।
-
সামরিক অভিযান: শায়েস্তা খান বিশাল নৌবহর এবং পদাতিক বাহিনী গঠন করে মগদের আস্তানা লণ্ডভণ্ড করে দেন।
-
মুক্তির আনন্দ: চট্টগ্রাম জয়ের ফলে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পায়, যার ফলে বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। (উৎস: মির্জা নাথান, ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’)
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ‘শায়েস্তা খানি’ দ্রব্যমূল্য
শায়েস্তা খানের সময় বাংলা ছিল ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। প্রচলিত আছে যে, তাঁর শাসনামলে বাংলায় চালের দাম এতটাই কম ছিল যে আট মণ চালে এক টাকা পাওয়া যেত। এই কিংবদন্তিটি আজও বাংলাদেশে “শায়েস্তা খানের আমলের চালের দাম” হিসেবে পরিচিত, যা মূলত তাঁর সুশাসনের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও খাদ্যের প্রাচুর্যকে নির্দেশ করে। (উৎস: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস: মুঘল আমল’)
স্থাপত্য ও শিল্পকলা
শায়েস্তা খান ছিলেন মহান স্থপতি। তাঁর নির্মিত স্থাপত্যগুলোতে মোগল স্থাপত্যের জাঁকজমক ও পরিশীলিত রুচির প্রতিফলন দেখা যায়:
-
লালবাগ কেল্লা: এটি শায়েস্তা খানের অমর কীর্তি। তিনি ১৬৭৮ সালে এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ শেষ করতে পারেননি, তবে এর নির্মাণশৈলী বাংলার মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।
-
চকবাজার মসজিদ ও কাটরা: ঢাকার নগর পরিকল্পনা এবং মসজিদের প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। স্থাপত্যবিদ্যায় তিনি যে আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছিলেন, তা পরবর্তী শতকগুলোতে ঢাকার রূপ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। (উৎস: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ)
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও জনহিতকর কাজ
শায়েস্তা খান কঠোর শাসক হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তাঁর শাসনামলে বাংলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছিল। তিনি শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং দরবারকে জ্ঞানী-গুণী মানুষের মিলনকেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের আর্থিক মেরুদণ্ড হিসেবে তিনি বাংলা থেকে যে রাজস্ব আদায় করেছিলেন, তা সম্রাট আওরঙ্গজেবকে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিযানে বিপুল সহযোগিতা করেছিল। (উৎস: ড. এ.এম. চৌধুরী, ‘Dynastic History of Bengal’)
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
শায়েস্তা খান ছিলেন একজন দূরদর্শী প্রশাসক। তাঁর শাসনকাল মোগল বাংলার সেই সময়কালকে নির্দেশ করে, যখন বাংলা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় শান্তি ও সমৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, তাঁর কঠোর কর ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অতিমাত্রায় আনুগত্যের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর কিছুটা চাপও সৃষ্টি হয়েছিল। তবুও বাংলার উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
উপসংহারে বলা যায়, শায়েস্তা খান কেবল একজন সুবাদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন মোগল বাংলার স্থপতিদের একজন। ঢাকা নগরীকে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করা এবং চট্টগ্রামকে জলদস্যুমুক্ত করার মাধ্যমে তিনি বাংলার যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন, তা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল’)