আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর রচিত ঐতিহাসিক দলিল থেকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। এটি কেবল একটি আইনি মামলা ছিল না, বরং এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য পাকিস্তানি সামরিক জান্তার একটি সুদূরপ্রসারী ও গভীর চক্রান্ত। এই মামলার মাধ্যমেই মূলত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক সংঘাত একটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে, যার শেষ পরিণতি ছিল দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং ভয়াবহ গণহত্যা।

আইয়ুব খানের স্বৈরতন্ত্র এবং মামলার উৎপত্তি

১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তানে যে দীর্ঘ সামরিক স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়েছিল, তার প্রধান হোতা ছিলেন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। পূর্ব বাংলার মানুষের ন্যায্য দাবি এবং স্বাধিকার আন্দোলনকে তিনি সবসময়ই কঠোর হাতে দমন করার চেষ্টা করেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলীর স্পষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, আইয়ুব খান তার শাসনামলে কতিপয় অপরিণামদর্শী এবং নির্বোধ সামরিক কর্মকর্তার প্ররোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মনগড়া একটি ষড়যন্ত্রের মামলা খাড়া করার হুকুম দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত। আইয়ুব খানের এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পেছনে তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির এক বিশাল পাহাড় ছিল। একটি মার্কিন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় পঁচিশ কোটি টাকার বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করেছিলেন এবং ইতালির একটি দ্বীপে পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিশাল জমিদারি গড়ে তুলেছিলেন। এই বিপুল দুর্নীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শোষণকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই মূলত তিনি রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

নথিপত্র প্রণয়নে ইয়াহিয়া খানের ভূমিকা

এই বানোয়াট ষড়যন্ত্র মামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো এর নথিপত্র প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া। তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মুহম্মদ ইয়াহিয়া খান এই মামলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী উল্লেখ করেছেন যে, আইয়ুব খানের সুস্পষ্ট আদেশে স্বয়ং ইয়াহিয়া খান এই কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সমস্ত নথিপত্র এবং দলিল তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই ছিলেন বাঙালি নেতৃত্বকে ধ্বংস করার এই নীল নকশার অন্যতম প্রধান কারিগর।

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুয়াজ্জেম হুসেনের আদর্শ ও অন্তর্ভুক্তি

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান এবং উল্লেখযোগ্য নাম ছিল অকুতোভয় দেশপ্রেমিক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুয়াজ্জেম হুসেনের। তিনি ছিলেন এককাট্টা এবং আপসহীন জাতীয়তাবাদের একনিষ্ঠ অনুসারী। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, মুয়াজ্জেম হুসেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের মানসিকতা ও চরিত্র খুব ভালোভাবে চিনতেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাদের সাথে বাঙালিদের মনের মিল বা স্বার্থের ঐক্য কখনোই সম্ভব নয়। এই দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই তিনি আওয়ামী লীগের ‘ছয় দফা’ দাবির পরিবর্তে সরাসরি ‘এক দফা’ বা পূর্ব বাংলার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তুলতেন। তার এই অকুতোভয় এবং স্পষ্টবাদী জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কথা আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়া খান উভয়ই খুব ভালোভাবে জানতেন। আর ঠিক এই কারণেই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার এই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ইয়াহিয়া খান তাকে এই ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম প্রধান আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

আইয়ুব খানের পতন এবং ক্ষমতার পালাবদল

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ক্রমাগত বৈষম্যের ফলে সমগ্র দেশজুড়ে এক তীব্র গণঅসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫ বা ২৬শে মার্চ প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন এই মামলার নথিপত্র প্রস্তুতকারী ইয়াহিয়া খান। সৈয়দ মুজতবা আলী মন্তব্য করেছেন যে, আইয়ুব খানের এই পতনে পূর্ব বাংলার কোনো মানুষের চোখেই এক ফোঁটা মহরমের জল বা শোকের অশ্রু ঝরেনি। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি হওয়া অবিচারের কথা স্বীকার করে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার এই প্রতিশ্রুতি ছিল সম্পূর্ণ ভণ্ডামি এবং সময়ক্ষেপণের কৌশল মাত্র।

১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ষড়যন্ত্রের নতুন অধ্যায়

ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক গোয়েন্দাদের ভুল প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ইয়াহিয়া খান আশা করেছিলেন যে, নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং তিনি বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজের সামরিক শাসন অব্যাহত রাখতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল তার এই ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন (সংরক্ষিত নারী আসনসহ) লাভ করে পাকিস্তানের সর্বমোট ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি মাত্র ৮১টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগের এই বিশাল বিজয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং ২২টি শোষক পুঁজিপতি পরিবারের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

ভুট্টো এবং সামরিক জান্তার আঁতাত

আওয়ামী লীগের এই বিজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে শুরু হয় নতুন এক ষড়যন্ত্র, যার শিকড় প্রোথিত ছিল সেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার মাঝেই। জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতেন, তিনি আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে ইয়াহিয়া খান যখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা শেষে ফিরে যান, তখন তিনি ১৭ই জানুয়ারি ভুট্টোর নিজ শহর লারকানা সফর করেন এবং সেখানে তারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, গুল হাসান এবং আকবর খানের মতো শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ইয়াহিয়া খানের খাস কামরায় প্রবেশ করে টেবিল থাপ্পড় দিয়ে দাবি জানান যে, ৩রা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে হবে। এই সামরিক জান্তাই মূলত পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

আলোচনার প্রহসন এবং গণহত্যার প্রস্তুতি

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খান পুনরায় ঢাকায় আসেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দীর্ঘ ১৬ দিন ধরে আলোচনার এক প্রহসনমূলক নাটক চালান। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সময়ক্ষেপণ করা, যাতে এই সুযোগে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বেসামরিক ফ্লাইটে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং অস্ত্রশস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে আনা যায়। সামরিক বাহিনীর এই সদস্যদের বেসামরিক পোশাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল যাতে সাধারণ মানুষ তাদের চিনতে না পারে, যদিও ঢাকার মানুষ তাদের ভাষা এবং আচরণ দেখে দ্রুতই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল।

চূড়ান্ত পরিণতি, অপারেশন সার্চলাইট এবং মুয়াজ্জেম হুসেনের আত্মত্যাগ

এই সমস্ত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং টালবাহানার চূড়ান্ত পরিণতি নেমে আসে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে। ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং তার সামরিক বাহিনীর কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খানকে নির্দেশ দিয়ে যান বাঙালিদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য, যাকে তিনি ‘সর্ট দেম আউট’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এর পরপরই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘুমন্ত এবং নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ট্যাঙ্ক, মর্টার এবং মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫শে মার্চের গভীর রাতে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তরেও তারা আকস্মিক আক্রমণ চালায়, যেখানে ফায়ার পাওয়ারের অভাব সত্ত্বেও বাঙালি জোয়ানরা বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম প্রধান আসামি, সেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুয়াজ্জেম হুসেন এই পাকিস্তানি জান্তার রোষানল থেকে বাঁচতে পারেননি। সৈয়দ মুজতবা আলী তার গ্রন্থে এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ভোরে পাকিস্তানি ঘাতকেরা মুয়াজ্জেম হুসেনকে তার স্ত্রীর চোখের সামনে অত্যন্ত পৈশাচিক ও নির্মমভাবে হত্যা করে। তার এই মর্মান্তিক মৃত্যু ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া এক চরম আত্মত্যাগ। যে মামলাটি আইয়ুব খান শুরু করেছিলেন তাকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য, সেই মামলার জের ধরেই শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের জীবন দিতে হলো।

নয় মাসের অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা

২৫শে মার্চের পর থেকে দীর্ঘ নয় মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনী সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে যে পৈশাচিক তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনাহীন। সৈয়দ মুজতবা আলী তার বর্ণনায় এই সময়কালকে এক মহাপ্রলয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই সময়কালে চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে চুয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই পাকিস্তানি জান্তার নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি। প্রখ্যাত কবি আবুল হোসেনের চুয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ পিতাকে কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ি থেকে টেনে বের করে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। উনিশ বছরের এক তরুণকে বিনা অপরাধে গুলি করে মারা হয়েছিল। এ যেন এক নরখাদক পিশাচরাজ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে চলা এক উন্মত্ত প্রেতনৃত্য।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অজ্ঞতা এবং পূর্ব বাংলার প্রতিরোধ

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে যে বিদ্বেষের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা ১৯৭১ সালে সামরিক বাহিনীর আচরণের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। সৈয়দ মুজতবা আলী উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে পাঞ্জাবি, পাঠান এবং বেলুচ সৈন্যরা পূর্ব বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাদের দিনের পর দিন মগজ ধোলাই করে শেখানো হয়েছিল যে বাঙালিরা প্রকৃত মুসলমান নয় এবং তারা ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা পরিচালিত। এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা নিরীহ বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল।

গণহত্যার বীভৎসতা এবং মানবতার অবমাননা

সৈয়দ মুজতবা আলীর বর্ণনায় পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার এমন কিছু চিত্র উঠে এসেছে যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক কিশোরকে তার মায়ের আঁচল থেকে ছিনিয়ে এনে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয়। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে সেই কিশোর কোনো চিৎকার বা কান্নাকাটি করেনি, বরং একজন সেনাকে ফিসফিস করে বলেছিল যেন তার মাকে তার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করতে বলা হয়। এই কথা শুনে সেই সেনা কিছুটা থমকে গেলেও, সামরিক জান্তার নির্দেশে পরিচালিত এই হত্যাযজ্ঞ থামেনি। অন্য একটি ঘটনায় উত্তরবঙ্গের একটি শহরে এক প্রৌঢ়া নারী তার কিশোরী কন্যার সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের দেখে তিনি ভয় পেয়ে একটি মসজিদের পাশ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং নামাজরত মুসল্লিদের সতর্ক করেন। মুসল্লিরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং মসজিদের ভেতরে ঢুকে স্বয়ং ইমাম সাহেবসহ সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ষড়যন্ত্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি

আগরতলা মামলার মতো ষড়যন্ত্রগুলোর পেছনে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সা ছিল না, এর একটি গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তিও ছিল। আইয়ুব খান থেকে শুরু করে ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সবাই পশ্চিম পাকিস্তানের ২১ বা ২২টি বৃহৎ পুঁজিপতি পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। এই পরিবারগুলো পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের উৎপাদিত নিম্নমানের পণ্যের একটি বিশাল বাজার বা কলোনি হিসেবে ব্যবহার করত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদ এই অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক রহমান সুবহান এবং ড. কামাল হোসেনকে পাঠিয়েছিলেন এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা কখনোই এই বৈষম্য দূর করতে আগ্রহী ছিল না, বরং তারা আগরতলা মামলার মতো দমনপীড়নের মাধ্যমেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চেয়েছিল।

ভুট্টোর দ্বিমুখী নীতি এবং ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’

এই সমগ্র ষড়যন্ত্রে জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ধূর্ত এবং সুবিধাবাদী। সৈয়দ মুজতবা আলী তার লেখায় ভুট্টোর রচিত ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’ গ্রন্থের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই বইটিতে ভুট্টো অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজের দোষগুলো গোপন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইয়াহিয়া খানের ওপর সমস্ত দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন। ভুট্টো দাবি করেছিলেন যে আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচির পেছনে কোনো বিদেশি হাতের ইন্ধন ছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর একটি অভিযোগ। প্রকৃতপক্ষে, ভুট্টো নিজেই সামরিক জান্তার সাথে হাত মিলিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অধিকারকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে, এমনকি এর জন্য যদি দেশ দ্বিখণ্ডিতও হয়, তাতেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

ধর্মের অপব্যবহার এবং মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়ন

পাকিস্তানি জান্তা নিজেদের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য ধর্মকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা প্রচার করত যে তারা ইসলামের রক্ষক এবং পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন ‘ইসলাম ইন ডেঞ্জার’ বা ইসলাম বিপন্ন হওয়ার একটি লক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে তাদের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী। সৈয়দ মুজতবা আলী তীব্র ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহিয়া খান ধর্মীয় পরিচয়ে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র মহররম মাসের মতো একটি সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে এই ভয়াবহ গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা ছিল একটি চরম পাপ বা ‘কবীরা গুনাহ’। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তাদের কাছে ধর্ম ছিল কেবল সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র, প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।

ইতিহাসের নৃশংসতম শাসকদের সাথে তুলনা

লেখক পাকিস্তানি জান্তার এই বর্বরতাকে পৃথিবীর ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরশাসকদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুরতাকে হিটলারের চেয়েও ভয়ংকর বলে বর্ণনা করেছেন এবং তার সহযোগী জেনারেল টিক্কা খানকে হিটলারের কুখ্যাত সহচর হিমলারের সাথে তুলনা করে ‘ভেজাল হিমলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হিটলার বা হিমলারের বিরুদ্ধেও কখনো নারীদের ওপর এমন পরিকল্পিত পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠেনি, যা ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব বাংলায় সংঘটিত করেছিল। এই পৈশাচিকতার জন্যই সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন যে, আগামী দিনের রূপকথায় রাক্ষসীর বর্ণনাও এই পাকিস্তানি সেনাদের নিষ্ঠুরতার কাছে তুচ্ছ মনে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণা, বৈষম্য এবং শোষণের একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আইয়ুব খানের নির্দেশে এবং ইয়াহিয়া খানের হাতে গড়া এই মামলাটিই পরবর্তীতে একাত্তরের ভয়াবহ গণহত্যা এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপন করেছিল। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুয়াজ্জেম হুসেনের মতো বীরদের আত্মত্যাগ এবং অগণিত সাধারণ মানুষের রক্তের বিনিময়েই শেষ পর্যন্ত এই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছিল। এই নয় মাসের ইতিহাস কেবল দুঃখ ও বেদনার নয়, বরং এটি অন্যায়, স্বৈরতন্ত্র এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অবিস্মরণীয় প্রতিরোধের ইতিহাস।