আহমদ শাহ আবদালী (যিনি আহমদ শাহ দুররানি নামেও পরিচিত) ছিলেন দুররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাকে আধুনিক আফগানিস্তানের জাতির জনক বা রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তিনি একজন দুর্ধর্ষ আক্রমণকারী এবং ১৭৬১ সালের ঐতিহাসিক ‘পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ’-এর প্রধান বিজয়ী হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত।
উত্থান ও ক্ষমতা লাভ
আবদালী প্রথম জীবনে পারস্যের (ইরান) শাসক নাদির শাহের সেনাবাহিনীতে একজন প্রতিভাবান অশ্বারোহী সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৭৪৭ সালে নাদির শাহ আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর, আফগান উপজাতীয় নেতারা একটি ‘লোয়া জিরগা’ (মহাসমাবেশ) আহ্বান করেন এবং তাকে আফগানদের রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। এ সময় তিনি ‘দুরর-ই-দুররানি’ (মুক্তার মুক্তা) উপাধি গ্রহণ করেন, যেখান থেকে তার রাজবংশ ও সাম্রাজ্য ‘দুররানি সাম্রাজ্য’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
ভারত আক্রমণ
১৭৪৮ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে আহমদ শাহ আবদালী একাধিকবার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। সে সময়কার দুর্বল মুঘল সাম্রাজ্য তার এই আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। তিনি দিল্লি, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবনসহ উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক লুণ্ঠন চালান এবং বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ নিজ দেশে পাচার করেন। পাঞ্জাব অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় শিখদের সাথেও তার বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৬১)
ভারতবর্ষে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক অভিযান ছিল মারাঠাদের বিরুদ্ধে। মারাঠারা যখন মুঘলদের দুর্বলতার সুযোগে উত্তর ভারতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল, তখন রোহিলা নেতা নজিব-উদ্দৌলা এবং অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার মতো স্থানীয় শাসকদের আমন্ত্রণে ও সহায়তায় তিনি মারাঠাদের মোকাবিলা করতে অগ্রসর হন। ১৭৬১ সালের ১৪ই জানুয়ারি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে তিনি তার উন্নত সামরিক রণকৌশল, হালকা কামান এবং দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্যে বিশাল মারাঠা বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।
ঐতিহাসিক প্রভাব ও পরিণতি
পানিপথের যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করলেও আবদালী ভারতবর্ষে স্থায়ী কোনো শাসন বা সাম্রাজ্য স্থাপন করেননি; বিপুল লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে তিনি আফগানিস্তানে ফিরে যান। তবে তার এই আক্রমণগুলোর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অভাবনীয়। তার উপর্যুপরি আক্রমণের ফলে মুঘল সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যায় এবং মারাঠাদের উত্থানও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। উত্তর ভারতে এই যে বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রকারান্তরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথকেই প্রশস্ত করেছিল।
১৭৭২ সালে কান্দাহারে এই পরাক্রমশালী আফগান শাসকের মৃত্যু হয়। আফগানদের কাছে তিনি ‘আহমদ শাহ বাবা’ (জাতির পিতা) হিসেবে পরম শ্রদ্ধেয় হলেও, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তিনি মূলত একজন নির্মম ও বিধ্বংসী আক্রমণকারী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছেন।