আগা মুহম্মদ ইয়েহিয়া খান ছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান, সামরিক শাসক এবং অবিভক্ত পাকিস্তানের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট। ১৯৬৯ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতনের পর তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং বিশ্ববাসীর কাছে তিনি ১৯৭১ সালের ভয়াবহ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম প্রধান খলনায়ক হিসেবে পরিচিত।
ইয়েহিয়া খান জাতিগতভাবে ছিলেন ‘কিজিলবাশ’ এবং ধর্মীয় পরিচয়ে শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, যদিও পশতু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন বলে অনেকেই তাকে পাঠান মনে করত। ১৯৬৯ সালের ২৫/২৬ মার্চ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব খান বিরোধী তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি আইয়ুব খানকে সরিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি হওয়া বৈষম্যের কথাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন।
তার শাসনামলে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইয়েহিয়ার সামরিক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদন ছিল যে নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, যার ফলে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দীর্ঘকাল নিজের ডিক্টেটরি বা সামরিক শাসন অব্যাহত রাখতে পারবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ইয়েহিয়ার চক্রান্ত ধাক্কা খায়। ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং নিজ সামরিক জান্তার (জেনারেল পীরজাদা, গুল হাসান, টিক্কা খান প্রমুখ) সাথে যোগসাজশ করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করার ষড়যন্ত্র করেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইয়েহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার এক প্রহসনমূলক নাটক সাজান। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, এই কালক্ষেপণের সুযোগে তিনি পিআইএ-এর বেসামরিক ফ্লাইটে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও অস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসেন। অবশেষে ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় তিনি গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং তার সামরিক জল্লাদদের “সর্ট দেম আউট” বা বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যার নির্দেশ দিয়ে যান। তার এই নির্দেশের ফলেই ওই রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ইতিহাসের অন্যতম পৈশাচিক ও বর্বর গণহত্যা শুরু হয়। লেখক তার ব্যক্তিগত চরিত্রকে চরম উচ্ছৃঙ্খল, মদ্যপ এবং নিষ্ঠুর হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তার পৈশাচিকতাকে হিটলার বা হিমলারের বর্বরতার সাথে তুলনা করেছেন।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই শোচনীয় পরাজয় ও পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানে তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ইয়েহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাকে গৃহবন্দি করা হয় এবং অন্তরালেই ১৯৮০ সালের ১০ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।