জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট এবং অত্যন্ত বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা, যিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ বা পিপিপি-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আধুনিক পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার প্রভাব যেমন গভীর, তেমনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তার ভূমিকা ইতিহাসবিদদের কাছে চরম সমালোচিত।
সিন্ধু প্রদেশের লারকানার এক ধনাঢ্য ও অভিজাত পরিবারে তার জন্ম। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এবং তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আইয়ুব খানের সাথে মতবিরোধের জেরে তিনি মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন এবং ‘ইসলাম, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র’-এর স্লোগান নিয়ে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) গঠন করেন।
১৯৭০ সালের পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যেখানে ভুট্টোর পিপিপি মাত্র ৮১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকে। গণতান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার গঠনের কথা থাকলেও, ভুট্টো এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্ব দাবি করেন। তিনি সামরিক জান্তা (যেমন জেনারেল পীরজাদা, গুল হাসান প্রমুখ), আমলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ২২টি শোষক পুঁজিপতি পরিবারের সাথে আঁতাত করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এমনকি ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত সদস্য যোগ দিলে তাদের ‘ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার’ হুমকিও তিনি দিয়েছিলেন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সাথে মিলে তিনি যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করেছিলেন, তা-ই মূলত ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ভয়াবহ গণহত্যা এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। সৈয়দ মুজতবা আলীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের এই ভাঙনের পেছনে সামরিক জান্তার পাশাপাশি ভুট্টোর অসীম ক্ষমতালিপ্সা এবং ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা অনেকাংশে দায়ী ছিল। পরবর্তীতে নিজের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাফাই গাইতে তিনি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’ (The Great Tragedy) নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ভুট্টো পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে প্রেসিডেন্ট এবং পরে ১৯৭৩ সালের নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের রাজনীতি পুনর্গঠন এবং পরমাণু কর্মসূচির ভিত্তি স্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া-উল-হক তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করেন। পরবর্তীতে একটি রাজনৈতিক হত্যা মামলায় বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।