মোহাম্মদ আইয়ুব খান ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছিলেন। তিনি সামরিক শাসন বা ‘মার্শাল ল’ জারি করে ক্ষমতা দখল করেন এবং পরবর্তীতে নিজেই নিজেকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তার শাসনামলে প্রবর্তিত ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী মূলত স্বৈরতন্ত্রের এক ভাঁড়ামি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের ক্ষেত্রে আইয়ুব খানের শাসনামল ছিল অত্যন্ত কঠোর। তার শাসনামলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য বাঙালি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কুখ্যাত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়। সৈয়দ মুজতবা আলীর বিবরণ অনুযায়ী, এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার যাবতীয় নথিপত্র খোদ আইয়ুব খানের নির্দেশেই প্রস্তুত করা হয়েছিল। তার এই দীর্ঘ স্বৈরশাসনে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার চরমভাবে লুণ্ঠিত হয়।
ক্ষমতায় থাকাকালীন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের জোরালো অভিযোগ ওঠে। একটি মার্কিন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত বছরের মধ্যেই (১৯৬৫ সাল নাগাদ) তিনি প্রায় পঁচিশ কোটি টাকার বিপুল ধনদৌলত, ইতালির একটি দ্বীপে বিশাল জমিদারি এবং বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে প্রচুর অর্থসম্পদ কুক্ষিগত করেছিলেন। এই ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সৈয়দ মুজতবা আলী তাকে একজন ‘আস্ত চোর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে আইয়ুব খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং একই সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব ও দুর্বার গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং তার শূন্য গদিতে সেনাপ্রধান আগা মুহম্মদ ইয়াহিয়া খানকে বসিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। লেখক মন্তব্য করেছেন যে, আইয়ুব খানের এই পতনে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে বিন্দুমাত্রও শোক বা আক্ষেপ ছিল না। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যান এবং ১৯৭৪ সালের ১৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।