বাংলার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক যুগ এক সুদীর্ঘ, ঘটনাবহুল এবং রূপান্তরমূলক অধ্যায়। সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আগমন করে। কিন্তু আঠারো শতকের মাঝামাঝি নাগাদ তারা শুধু বণিক থেকে এই অঞ্চলের একচ্ছত্র শাসকে পরিণত হয়। আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো জনমানবশূন্য অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের বিপরীতে বাংলাই ছিল প্রথম অত্যন্ত উন্নত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল যেখানে ইউরোপীয়রা একটি পূর্ণাঙ্গ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।
নিম্নে এই যুগের বিস্তারিত পটভূমি ও ইতিহাস তুলে ধরা হলো:
সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথ
ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতে, এই সাম্রাজ্য বিস্তার কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিপত্র থেকে জানা যায়, লন্ডনে অবস্থিত কোর্ট অব ডাইরেক্টরস সব সময়ই বাংলায় সরাসরি রাজ্য স্থাপনের বিপক্ষে ছিল। কিন্তু কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লোভ এবং বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বাসনা থেকে তারা প্রায়শই স্থানীয় শাসকদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ত।
১৬৫১ সালে বাংলার সুবাহদার শাহ সুজার কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি নিশান বা আদেশের মাধ্যমে কোম্পানি বার্ষিক ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার পায়। কিন্তু কোম্পানির কর্মকর্তারা এই সুবিধা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও বেআইনিভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে তাদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধ। এরপর ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলায় কোম্পানির শাসন পাকাপোক্ত হয়।
দ্বৈত শাসন ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিমের পরাজয়ের পর রবার্ট ক্লাইভ সরাসরি ক্ষমতা দখল না করে এক কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। ১৭৬৫ সালে তিনি মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করেন। এই ব্যবস্থায় নবাবের হাতে থাকে শাসন ও বিচারের দায়িত্ব, আর কোম্পানির হাতে থাকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা। একেই ‘দ্বৈত শাসন’ বলা হয়।
এই ব্যবস্থায় নবাবের ছিল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, আর কোম্পানির ছিল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। কোম্পানির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার সম্পদ লুন্ঠন করে নিজেদের এশীয় বাণিজ্যের মূলধন জোগাড় করা। এই চরম শোষণের ফলে বাংলার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলশ্রুতিতে ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়।
কর্নওয়ালিসের সংস্কার ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা এবং কোম্পানির চরম দুর্নীতির কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭৭২ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট এবং ১৭৮৪ সালের পিটস ইন্ডিয়া অ্যাক্ট পাস করে কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এরপর লর্ড কর্নওয়ালিসকে গভর্নর জেনারেল হিসেবে পাঠানো হয় একটি স্থিতিশীল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব দিয়ে।
১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চালু করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হয় এবং সরকারের রাজস্ব চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত একটি শক্তিশালী জমিদার শ্রেণি তৈরি করা। পাশাপাশি তিনি প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজান এবং সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে একটি উচ্চ বেতনভুক্ত আমলাতন্ত্র গড়ে তোলেন।
প্রেসিডেন্সি শাসনের বিবর্তন
ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ যেমন বোম্বে ও মাদ্রাজের তুলনায় বাংলা প্রেসিডেন্সি প্রশাসনিকভাবে বেশ অবহেলিত ছিল। বাংলার জন্য কোনো স্বতন্ত্র গভর্নর বা কাউন্সিল ছিল না, এটি সরাসরি গভর্নর জেনারেল দ্বারা শাসিত হতো। প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর অজুহাতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ করেন। পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একে স্বাগত জানালেও হিন্দু এলিট শ্রেণি এর তীব্র বিরোধিতা করে। প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার এই ঘটনা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করে।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দেশভাগ
১৯২০ সালের পর থেকে বাংলার রাজনীতি ক্রমশ সাম্প্রদায়িক রূপ নিতে থাকে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ১৯২৩ সালের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ হিন্দু, মুসলিম ঐক্যের একটি বড় উদ্যোগ হলেও ১৯২৫ সালে তার মৃত্যুর পর তা ব্যর্থ হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ জোট সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের পথ ধরে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলার আর্থ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনে।
-
প্রশাসনিক রূপান্তর: মুঘল আমলে স্থানীয় পঞ্চায়েত ও বিচার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা জেলা কালেক্টর, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে অসীম ক্ষমতা তুলে দেয়, যেখানে দেশীয় মানুষের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না।
-
শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসসাধন: মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মক্তব ও টোলভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশরা তা বন্ধ করে ব্যয়বহুল পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। ফলে শিক্ষা কেবল উচ্চবিত্তের কুক্ষিগত হয় এবং সাধারণ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। ১৮৭২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাঙালিদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
-
গ্রামীণ অর্থনীতির বিপর্যয়: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে জমির প্রকৃত মালিক কৃষকরা তাদের অধিকার হারায়। কৃষকরা হয়ে পড়ে জমিদারদের ইচ্ছাধীন প্রজা। এর ফলে গ্রামবাংলায় একটি অত্যন্ত ক্ষমতাবান হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং চরম দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত মুসলিম কৃষক শ্রেণির উদ্ভব হয়। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই পরবর্তীতে বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অন্যতম মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
-
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: ব্রিটিশ সরকার সচেতনভাবে বাংলার মানুষের ওপর পাশ্চাত্য সভ্যতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা দেশীয় সমাজ ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে নিজেদের সংস্কৃতিকে ‘সভ্য’ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
উপসংহার
প্রায় দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন বাংলাকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। রেলপথ, ডাক ব্যবস্থা বা আধুনিক শিক্ষার মতো কিছু কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ ও শাসনকে আরও সহজ করা। এই যুগের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের ক্ষত আজ অবধি উপমহাদেশের রাজনীতি ও সমাজে গভীরভাবে দৃশ্যমান। বাংলার ঔপনিবেশিক ইতিহাস তাই শুধুই পরাধীনতার গল্প নয়, এটি এক সমৃদ্ধ জাতির আর্থ, সামাজিক কাঠামোর পদ্ধতিগত ধ্বংসের এক করুণ দলিল।