ঔষধ

ঔষধ (Drug) বলতে সাধারণত এমন সব রাসায়নিক দ্রব্যকে বোঝায়, যা মানুষ বা প্রাণীর রোগ নির্ণয়, নিরাময়, উপশম, চিকিৎসা বা রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, ঔষধ হলো এমন একটি পদার্থ যা শরীরে প্রবেশ করার পর তার শারীরবৃত্তীয় বা জৈবরাসায়নিক কার্যকলাপে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ঔষধ প্রাকৃতিক উৎস (যেমন:উদ্ভিদ, প্রাণী বা খনিজ) থেকে সংগ্রহ করা হতে পারে, অথবা গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি করা হতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঔষধের প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য থাকে: প্রথমত, রোগ নিরাময় করা (যেমন:অ্যান্টিবায়োটিক, যা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে); এবং দ্বিতীয়ত, রোগের উপসর্গ বা যন্ত্রণা উপশম করা (যেমন:অ্যাসপিরিন বা প্যারাসিটামল, যা ব্যথা ও জ্বর কমায়)। এছাড়া রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত টিকা বা ভ্যাকসিনও ঔষধের অন্তর্ভুক্ত, যা শরীরে নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা অ্যান্টিবডি গড়ে তোলে।

অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ (Essential Drugs)

বিশ্বে আবিষ্কৃত হাজার হাজার ঔষধের মধ্যে সব ঔষধ সব দেশের জন্য সমানভাবে জরুরি নয়। ‘অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ’ বা Essential Drugs বলতে সেইসব ঔষধকে বোঝায়, যা একটি দেশের জনগণের প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো মেটানোর জন্য অপরিহার্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের ধারণাটি প্রতিটি দেশের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং স্বাস্থ্য কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। জীবন রক্ষাকারী সব ঔষধই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ঔষধ কোনো দেশের অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করে ওই দেশে নির্দিষ্ট রোগের ব্যাপকতার ওপর। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই তালিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে সীমিত বাজেটের মধ্যে জনগণের জন্য সর্বাধিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশে আশির দশকে অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকায় প্রায় ২০০টি ঔষধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। নব্বইয়ের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের আলোচনার প্রেক্ষিতে এই তালিকাটি আরও দীর্ঘ ও যুগোপযোগী করা হয়।

ঔষধের যৌক্তিক ব্যবহার (Rational Use of Drugs)

ঔষধের যৌক্তিক ব্যবহার বলতে বোঝায় সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর, সঠিক রোগীকে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ের জন্য এবং সর্বনিম্ন খরচে উপযুক্ত ঔষধ প্রদান করা। বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও ঔষধের অযৌক্তিক বা যথেচ্ছ ব্যবহার একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

এর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক উদাহরণ হলো অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। বাংলাদেশে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (Prescription) ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়। সাধারণ জ্বর বা সর্দিতেও মানুষ না জেনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে এবং কোর্স সম্পন্ন করে না। এর ফলে মানবদেহে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো ওই ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ (Antibiotic Resistance) গড়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে, সাধারণ এবং কম দামি অ্যান্টিবায়োটিকগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মহামারি আকারে প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

মাদকাসক্তি ও ঔষধের অপব্যবহার (Drug Abuse and Addiction)

রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে তৈরি কিছু ঔষধ (যেমন—চেতনানাশক, বেদনানাশক, ঘুমের বড়ি বা মানসিক অবসাদ দূর করার ঔষধ) যখন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া, বিনোদনের উদ্দেশ্যে বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য নিয়মিত ও অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করা হয়, তখন তাকে মাদকাসক্তি বা ঔষধের অপব্যবহার বলা হয়।

মাদকের শ্রেণিবিভাগ:

সচরাচর ব্যবহৃত মাদকদ্রব্যগুলোকে প্রধানত ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

১. আফিমজাত মাদক (Opiates): আফিম, মরফিন, হেরোইন (পপি গাছ থেকে তৈরি)।

২. অবসাদ ও নিদ্রা আনয়নকারী (Depressants): বারবিচুরেট বা ঘুমের ঔষধ।

৩. উত্তেজক (Stimulants): কোকেন, যা স্নায়ুতন্ত্রকে চরমভাবে উদ্দীপ্ত করে।

৪. দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টিকারী (Hallucinogens): এল.এস.ডি (LSD), মেসকালাইন বা ফেনসাইক্লিডিন। বাংলাদেশে কালোবাজারে ফেনসিডিল (Phensedyl) এই জাতীয় মাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে অপব্যবহৃত হয়।

৫. গাঁজা জাতীয় (Cannabis): গাঁজা, চরস, হাশিশ।

৬. শ্বাসের সাথে নেওয়া দ্রব্য (Inhalants): বিভিন্ন ধরনের গাম বা অ্যারোসল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:

বাংলাদেশে মাদকাসক্তি একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান রুটের কাছাকাছি হওয়ার কারণে দেশে ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা এবং পেথিডিন ইনজেকশনের মতো মাদকের বিস্তার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ এর শিকার।

মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৮৯ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে সরকারি উদ্যোগে ‘কমিউনিটি ড্রাগ এডিকশন ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করা হলেও তা বর্তমানে অনেকটাই অকার্যকর। বেসরকারি পর্যায়ে অনেক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠলেও সেগুলোর বেশিরভাগেই আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, দক্ষ চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অভাব রয়েছে।

বাংলাদেশের ঔষধ সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা

বাংলাদেশে ঔষধ উৎপাদন, আমদানি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপণন পরিচালনার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আইন ও অধ্যাদেশ রয়েছে:

১. ঔষধ আইন, ১৯৪০ (The Drugs Act, 1940): এটি ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্রথম ঔষধ আইন, যা পরবর্তীতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ তৈরি এবং আমদানি রোধ করা। এই আইন অনুযায়ী, কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট বা বিশেষজ্ঞরাই ঔষধ তৈরি ও বিক্রয়ের সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন। ঔষধ পরিদর্শকদের মাধ্যমে কারখানা ও ফার্মেসি পরিদর্শন এবং নমুনা সংগ্রহের বিধান এই আইনে রয়েছে।

২. ক্ষতিকর ঔষধ আইন, ১৯৫১ (Dangerous Drugs Act, 1951): অভ্যাস সৃষ্টিকারী এবং নেশাকর ঔষধ (যেমন—কোকেন, আফিম, গাঁজা) নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই আইন প্রণীত হয়। এই আইনের অধীনে কোকা, পপি বা গাঁজা গাছের চাষ, মজুত, আমদানি বা রপ্তানি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

৩. ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ (Drug Control Ordinance, 1982): বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৮২ সালের আগে বাজারে হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ঔষধ প্রচলিত ছিল। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে:

  • একটি ‘ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’ এবং ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠিত হয়।

  • ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় শত শত ঔষধ বাতিল করা হয়।

  • অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়।

  • ঔষধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, ফলে ঔষধ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসে।

৪. জাতীয় ঔষধনীতি (National Drug Policy): বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি, যারা ‘আলমা-আতা’ ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে ১৯৮২ সালে একটি যুগান্তকারী জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ, কার্যকর এবং সুলভ মূল্যে প্রয়োজনীয় ঔষধ নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে এই নীতিমালার একটি সংশোধিত ও আধুনিক সংস্করণ ‘জাতীয় ঔষধনীতি ২০০৫’ প্রণীত হয়।

ঔষধ প্রশাসন ও মান নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশে ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং আইনি কাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (Directorate General of Drug Administration – DGDA)। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই সংস্থাটি ঔষধ কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স প্রদান, কাঁচামাল আমদানির অনুমতি এবং ঔষধের গুণগত মান তদারকি করে থাকে।

ঔষধের মান পরীক্ষার জন্য সরকারের দুটি প্রধান ‘ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি’ রয়েছে—একটি ঢাকার মহাখালীতে (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধীনে) এবং অপরটি চট্টগ্রামে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ এবং ঔষধ কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় এই ল্যাবরেটরিগুলোর জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা এখনও বেশ সীমিত।

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প ও উৎপাদন

স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঔষধ শিল্প চরম অবহেলার শিকার ছিল। দেশের ঔষধ বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিল হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির দখলে, যাদের বেশিরভাগ কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর পর দেশে জীবনরক্ষাকারী ঔষধের চরম সংকট দেখা দেয়।

তবে ১৯৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারির পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দেশীয় কোম্পানিগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। বর্তমানে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং সফল শিল্প খাত:

  • স্বয়ংসম্পূর্ণতা: বর্তমানে দেশের মোট ঔষধ চাহিদার প্রায় ৯৭% স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধ দিয়ে মেটানো হয়।

  • পণ্যের বৈচিত্র্য: ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ থেকে শুরু করে ইনজেকশন, ইনহেলার, ক্রিম, সাপোজিটরি এবং হার্ড জিলাটিন ক্যাপসুলের মতো অত্যাধুনিক সামগ্রী এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে।

  • কাঁচামাল উৎপাদন (API): বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এখন ঔষধের মৌলিক কাঁচামাল (Active Pharmaceutical Ingredients) যেমন প্যারাসিটামল, অ্যামোক্সিসিলিন, ডাইক্লোফেনাক ইত্যাদি দেশেই উৎপাদন করছে।

  • রপ্তানি বাণিজ্য: দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের ঔষধ এখন ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার শতাধিক দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

  • সম্পূরক শিল্পের বিকাশ: ঔষধ শিল্পের হাত ধরে দেশে উন্নত মানের প্যাকেজিং শিল্প, গ্লাস ও প্লাস্টিক বোতল তৈরি এবং মুদ্রণ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:

দেশের ঔষধ শিল্প ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। পেটেন্ট আইনের কড়াকড়ি, গবেষণায় (R&D) বিনিয়োগের অভাব এবং মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এই খাতের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। তবুও, সাশ্রয়ী শ্রমবাজার, দক্ষ ফার্মাসিস্ট এবং ক্রমাগত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প আগামী দিনে বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।