ফরিদপুর বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন জেলা। এটি কেবল তার ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই নয়, বরং সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্মস্থান হিসেবেও বিশেষভাবে পরিচিত। পদ্মা ও কুমার নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদটি আদিতে ‘ফতেহবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে প্রসিদ্ধ কামেল সাধক শাহ শেখ ফরিদউদ্দীনের নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয় ‘ফরিদপুর’। ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ আমলে লর্ড ডালহৌসি ঢাকা জেলাকে ভেঙে ফরিদপুর জেলা সৃষ্টি করেন।
ফরিদপুরের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ:
-
ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান: ফরিদপুরে রয়েছে প্রচুর ঐতিহাসিক স্থাপনা যা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর স্বাক্ষর বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মধুখালীর মথুরাপুর দেউল, ভাঙ্গার পাতরাইল মসজিদ এবং আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল। এছাড়া পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি ও সমাধি, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাইশ রশি জমিদার বাড়ি এবং রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (যা বৃহত্তর ফরিদপুরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ) পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
-
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ফরিদপুর বহু গুণী ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি। বিশ্বনন্দিত পল্লী কবি জসীম উদ্দীন, প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের মতো ব্যক্তিদের স্মৃতি এই অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। কুমার নদী ফরিদপুর শহরকে দুভাগে বিভক্ত করেছে, যা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
-
ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক অবস্থান: ফরিদপুর আয়তনের দিক থেকে প্রায় ২,০৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত। প্রশাসনিকভাবে এটি ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত—ফরিদপুর সদর, মধুখালী, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, সালথা, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন। এটি পদ্মা সেতুর সুবাদে রাজধানীর সাথে চমৎকার সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে সংযুক্ত, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
-
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা: ফরিদপুর প্রধানত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। পদ্মা ও কুমার নদীর পলিমাটি সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানকার ভূমি অত্যন্ত উর্বর। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে জেলাটি বর্তমানে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ফরিদপুর তার অতীত ঐতিহ্য এবং আধুনিক উন্নয়নের এক অনন্য মেলবন্ধন। একদিকে মথুরাপুর দেউলের মতো প্রাচীন স্থাপত্য, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর কল্যাণে আধুনিক কর্মচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে ফরিদপুর বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।