ফৌজদারি কার্যবিধি (সংক্ষেপে CrPC) হলো বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থায় অপরাধমূলক আইনের প্রয়োগ এবং বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার প্রধান পদ্ধতিগত বা ব্যবহারিক আইন (Procedural Law)। ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এই আইনটি প্রণীত হয় এবং ওই বছরের ১লা জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে এই আইনটি অপরিবর্তিতভাবে (কিছু সংশোধনীসহ) গৃহীত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মূলত দুটি আইন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে— দণ্ডবিধি (Penal Code) এবং ফৌজদারি কার্যবিধি। দণ্ডবিধিতে (১৮৬০) সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে কোন কাজটি অপরাধ এবং তার শাস্তি কী হবে। অন্যদিকে, সেই অপরাধীকে কীভাবে গ্রেপ্তার করা হবে, ঘটনার তদন্ত কীভাবে চলবে, আদালতে কীভাবে বিচার পরিচালিত হবে এবং রায় কীভাবে কার্যকর করা হবে— তার সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়া দেওয়া হয়েছে এই ফৌজদারি কার্যবিধিতে।
এই আইনের আওতায় ফৌজদারি মামলার প্রাথমিক পর্যায় থেকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত নিয়মাবলি বিধৃত রয়েছে। থানায় প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এজাহার (FIR) দায়ের অথবা আদালতে সরাসরি নালিশি মামলা (Complaint) দায়েরের মাধ্যমে একটি ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর পুলিশ কীভাবে ঘটনার তদন্ত (Investigation) করবে, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করবে, সন্দেহভাজন স্থানে তল্লাশি চালাবে এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তার বা প্রয়োজনে রিমান্ডে নেবে, তার সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এই কার্যবিধিতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আদালতের গঠন ও ক্ষমতার সীমানাও এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফৌজদারি কার্যবিধিতে দেশের ফৌজদারি আদালতগুলোর গঠন এবং তাদের শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে। মূলত দায়রা আদালত (Sessions Court) এবং বিভিন্ন স্তরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোর (Magistrate Courts) বিচারিক ক্ষমতা, দণ্ড প্রদানের এখতিয়ার এবং মামলা পরিচালনার পদ্ধতি এখানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
জামিন, বিচার প্রক্রিয়া এবং রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকারের বিধানও ফৌজদারি কার্যবিধির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন (Bail) পাওয়ার শর্তাবলী, জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা, অভিযোগ গঠন (Charge framing), সাক্ষ্যগ্রহণ এবং চূড়ান্ত রায় ঘোষণার প্রতিটি আইনি ধাপ এই কার্যবিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তাছাড়া, নিম্ন আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে কোনো পক্ষ কীভাবে উচ্চ আদালতে আপিল (Appeal) বা রিভিশন (Revision) দায়ের করতে পারবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখাও এখানে দেওয়া আছে।
পরিশেষে, ফৌজদারি কার্যবিধি হলো দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি বা মেরুদণ্ড। সময়ের সাথে সাথে বিচার প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, বিচারবিভাগ পৃথকীকরণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে এই আইনের বেশ কিছু যুগান্তকারী সংশোধনী এনেছে। এই আইনের মূল দার্শনিক ভিত্তি হলো— আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হয় এবং প্রকৃত অপরাধী যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার কৃতকর্মের শাস্তি পায়।