ফৌজদারি বিচার

ফৌজদারি বিচার বা ক্রিমিনাল ট্রায়াল হলো এমন একটি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র বা বাদীপক্ষ কর্তৃক আনীত কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আদালত কর্তৃক পরীক্ষা করে দেখা হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির দোষ বা নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থায় এই ফৌজদারি বিচার মূলত ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) এবং ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন (Evidence Act) দ্বারা পরিচালিত হয়।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান দার্শনিক মূলনীতি হলো— “প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ” (Presumed innocent until proven guilty)। অর্থাৎ, কোনো সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না; রাষ্ট্রপক্ষকেই অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী একটি সাধারণ ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  1. অপরাধ আমলে নেওয়া এবং আসামির উপস্থিতি: তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র (Charge Sheet) দাখিল করার পর ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক সেটি পর্যালোচনা করে অপরাধটি বিচারের জন্য আমলে নেন (Taking Cognizance)। এরপর আসামিকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য সমন বা পরোয়ানা জারি করা হয়। আসামি উপস্থিত হলে বা তাকে গ্রেপ্তার করে আনা হলে তিনি জামিনের আবেদন করতে পারেন এবং আদালত আইনি শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দিতে বা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন।
  2. অভিযোগ গঠন (Charge Framing): এটি বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই ধাপে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ে শোনান এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি দোষ স্বীকার করছেন (Plead guilty), নাকি বিচার দাবি করছেন (Claim to be tried)। আসামি দোষ স্বীকার করলে আদালত তখনই তাকে সাজা দিতে পারেন। আর তিনি যদি বিচার দাবি করেন, তবে মূল বিচার বা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়।
  3. রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ (Prosecution Evidence): এই ধাপে রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ তাদের অভিযোগ প্রমাণের জন্য আদালতে সাক্ষী হাজির করে। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পাবলিক প্রসিকিউটর) সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন, যাকে আইনি পরিভাষায় বলা হয় ‘জবানবন্দি’ বা Examination-in-Chief। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী সেই সাক্ষীদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য এবং তাতে কোনো অসংগতি আছে কি না তা প্রমাণের জন্য পাল্টা প্রশ্ন করেন, যা ‘জেরা’ বা Cross-Examination নামে পরিচিত। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ডাক্তারি সনদ (মেডিকেল রিপোর্ট) এবং আলামতগুলো (Exhibits) আদালতে প্রদর্শন করে।
  4. আসামি পরীক্ষা (Examination of the Accused – ৩৪২ ধারা): রাষ্ট্রপক্ষের সমস্ত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আদালত আসামিকে সরাসরি পরীক্ষা করেন। এ সময় আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষীদের দেওয়া অপরাধমূলক তথ্য বা প্রমাণগুলো আদালত আসামিকে পড়ে শোনান এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের বা এসব প্রমাণের বিষয়ে তার নিজের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেন।
  5. সাফাই সাক্ষ্য (Defense Evidence): আদালত আসামিকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি নিজের নির্দোষ হওয়ার স্বপক্ষে কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ (সাফাই সাক্ষ্য) উপস্থাপন করতে চান কি না। আসামি চাইলে নিজের পক্ষে আদালতে সাক্ষী (Defense Witness) হাজির করতে পারেন। আসামিপক্ষের এই সাক্ষীদের তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেরা করার সুযোগ পান।
  6. যুক্তিতর্ক (Arguments): উভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইনের বিভিন্ন ধারা এবং উচ্চ আদালতের নজির (Precedents) বিশ্লেষণ করে আদালতের সামনে নিজ নিজ পক্ষের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে এবং আসামিপক্ষ প্রমাণের অভাব বা আইনি দুর্বলতা তুলে ধরে আসামির বেকসুর খালাস দাবি করে।
  7. রায় ঘোষণা (Judgment): যুক্তিতর্ক শোনার পর বিচারক মামলার সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথি ও আইনি যুক্তিতর্ক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। রায়ে যদি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে (Beyond reasonable doubt) প্রমাণিত হয়, তবে আদালত তাকে ‘দণ্ডিত’ (Convicted) করে আইন অনুযায়ী সাজা প্রদান করেন। আর যদি রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয় বা আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকে, তবে আদালত আসামিকে ‘বেকসুর খালাস’ (Acquitted) প্রদান করেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে যেকোনো পক্ষই উচ্চ আদালতে আপিল করার আইনি অধিকার রাখেন।