জবানবন্দি

‘জবানবন্দি’ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এবং সাক্ষ্য আইনে অত্যন্ত পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। সহজ কথায়, কোনো অপরাধ বা ঘটনা সম্পর্কে কোনো ব্যক্তি (তিনি সাক্ষী বা আসামি হতে পারেন) পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের সামনে যে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেন, তাকেই আইনি পরিভাষায় জবানবন্দি বলা হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) এবং সাক্ষ্য আইন (Evidence Act) অনুযায়ী জবানবন্দিকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

১. পুলিশের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দি (১৬১ ধারার জবানবন্দি): ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী কোনো মামলার তদন্ত চলাকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা (IO) ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। আইনি পরিভাষায় একে ১৬১ ধারার জবানবন্দি বলা হয়।

  • আইনি মূল্য:এই জবানবন্দিতে সাক্ষীর স্বাক্ষর নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। এটি আদালতে মূল সাক্ষ্য বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সরাসরি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিচার চলাকালে সাক্ষীকে ‘জেরা’ করার সময়, সাক্ষী যদি আদালতে দাঁড়িয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া তার আগের কথার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু বলেন, তবে সেই অসংগতি প্রমাণের জন্য এই জবানবন্দি ব্যবহার করা হয়।

২. ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দি (১৬৪ ধারার জবানবন্দি): ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলাকালে কোনো মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট এই জবানবন্দি রেকর্ড করতে পারেন। বিচার শুরুর আগেই এটি গ্রহণ করা হয় এবং এটি দুই ধরনের হতে পারে:

  • স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (Confessional Statement):যখন কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিবৃতি দেন। এটি রেকর্ড করার আগে ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিত হন যে আসামির ওপর পুলিশ বা অন্য কারো কোনো জোর-জুলুম বা প্রলোভন নেই। একটি ত্রুটিমুক্ত ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আসামির সাজা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি প্রমাণ।
  • সাক্ষীর জবানবন্দি:অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর মামলার সাক্ষীরা যাতে পরে ভয়ভীতি বা প্রলোভনে পড়ে আদালতে তাদের বক্তব্য পাল্টে না ফেলেন, সেজন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সেই সাক্ষীর জবানবন্দি আগেভাগেই রেকর্ড করিয়ে রাখেন।

৩. আদালতে সাক্ষীর জবানবন্দি (Examination-in-Chief): সাক্ষ্য আইনের ১৩৭ ধারা অনুযায়ী আদালতে মূল বিচার (Trial) চলাকালে সাক্ষীর এই জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। যে পক্ষ (রাষ্ট্রপক্ষ বা আসামিপক্ষ) সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে, সেই পক্ষের আইনজীবী বিচারকের সামনে সাক্ষীকে প্রশ্ন করে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনেন।

  • প্রক্রিয়া:সাক্ষী ধর্মীয় গ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই জবানবন্দি দেন। বিচারক বা তার পেশকার তা হুবহু লিপিবদ্ধ করেন এবং শেষে সাক্ষীর স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। জবানবন্দি শেষ হওয়ার পরই অপর পক্ষের আইনজীবী ওই সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য তাকে ‘জেরা’ (Cross-Examination) করেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় একটি মামলা প্রমাণের মূল ভিত্তিই হলো এই জবানবন্দি। সাক্ষীদের সঠিক জবানবন্দি এবং পরবর্তী জেরার চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আদালত ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।