মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলাদেশের এক প্রখ্যাত, অবিসংবাদিত ও জনপ্রিয় বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা। আজীবন শোষিত, বঞ্চিত, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সোচ্চার থাকার কারণে তিনি আপামর জনসাধারণের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

১৮৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাজি শরাফত আলী খান। অল্প বয়সেই তিনি পিতৃমাতৃহীন হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় কিছুদিন পড়াশোনা করেন। সেখানেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের এবং ইসলামী সাম্যবাদের অনুপ্রেরণা লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি মক্তবে শিক্ষকতা করেন এবং একই সাথে জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন।

আসামের রাজনীতি ও ‘ভাসানী’ উপাধি

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে তিনি আসামে পাড়ি জমান। সেখানে বাঙালি অভিবাসী কৃষকদের ওপর স্থানীয় প্রশাসনের বৈষম্যমূলক ‘লাইন প্রথা’,র (Line System) বিরুদ্ধে তিনি তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে তিনি কৃষকদের এক বিশাল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং তাদের অধিকার আদায়ে জোরালো বক্তব্য রাখেন। এই সম্মেলনে তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব ও বাগ্মিতার কারণে মুগ্ধ সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘ভাসানী’ উপাধিতে ভূষিত করে, যা তাঁর নামের সাথে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ও ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন এবং এ দেশের রাজনীতিতে প্রবলভাবে সক্রিয় হন। মুসলিম লীগের গণবিরোধী নীতির প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তাঁরই নেতৃত্বে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম এবং প্রধান বিরোধী দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং কারাবরণ করেন।

ন্যাপ গঠন ও কাগমারী সম্মেলন

পররাষ্ট্র নীতি এবং অন্যান্য মতাদর্শগত (বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা) কারণে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং বামপন্থী ও প্রগতিশীল নেতাদের নিয়ে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠন করেন। একই বছর টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘কাগমারী সম্মেলন’,এ তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে তাঁর সেই বিখ্যাত “আসসালামু আলাইকুম” (বিদায় বা বিচ্ছিন্নতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত) উচ্চারণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশে ভূমিকা

১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে তিনি অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদান করেন। সত্তরের নির্বাচনে তিনি অংশ না নিলেও, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে অবস্থান করে বিশ্ব জনমত গঠনে কাজ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের নদীর নাব্যতা হ্রাস ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে তিনি ঐতিহাসিক ‘ফারাক্কা লংমার্চ’,এ নেতৃত্ব দেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক কীর্তি।

মৃত্যু ও স্মৃতি

আজীবন শোষিতের পক্ষে সংগ্রাম করা এই মহান ও নির্মোহ জননেতা ১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁকে অত্যন্ত সসম্মানে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ রক্ষার্থে টাঙ্গাইলের সন্তোষে ‘মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।