অক্ষয়কুমার দত্ত

অক্ষয়কুমার দত্ত ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ যুগের অন্যতম চিন্তাবিদ, লেখক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই বর্ধমান জেলার চুপী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি বাবাকে হারান এবং চরম দারিদ্র্যের মাঝে তাকে বড় হতে হয়। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘকাল নানা শারীরিক অসুখে ভুগেছেন। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে বছর দুয়েক পড়ার পর বাবার মৃত্যুর কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি উপার্জনের দিকে মন দেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও নিজের প্রবল ইচ্ছায় তিনি সংস্কৃত, ফারসি, জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি ‘অনঙ্গমোহন’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার জন্য ইংরেজি সংবাদপত্র থেকে প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে তার গদ্য রচনার সূত্রপাত ঘটে। ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা’ স্থাপন করলে, তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে তত্ত্ববোধিনী সভা থেকে তার লেখা ‘ভূগোল’ নামক একটি বালপাঠ্য বই বের হয়। পরবর্তীতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অক্ষয়কুমার দত্তের প্রবন্ধ সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়। এর ফলে তিনি মাসিক ৩০ টাকা বেতনে ব্রাহ্মসমাজ ও তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ আগস্ট তার সম্পাদনায় পত্রিকাটি আত্মপ্রকাশ করে এবং তার দক্ষ পরিচালনায় এটি সে সময়ের শ্রেষ্ঠ বাংলা সাময়িকপত্রে পরিণত হয়। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতায় নর্ম্যাল স্কুল স্থাপন করলে, তিনি ১৫০ টাকা বেতনে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগ দেন। কিন্তু মাথার প্রদাহজনিত রোগের কারণে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন।

১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অপর ২১ জন বন্ধুর সঙ্গে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন এবং এই দলটিই ছিল প্রথম দীক্ষিত ব্রাহ্ম। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে বিশ্বাসী অক্ষয়কুমার বেদের অভ্রান্ততা স্বীকার করতেন না এবং এ নিয়ে জোর আন্দোলন শুরু করেন। তার প্রবল যুক্তির কারণে দেবেন্দ্রনাথ ও ব্রাহ্মসমাজ শেষ পর্যন্ত বেদের অভ্রান্ততায় বিশ্বাস বর্জন করে। ব্রাহ্মসমাজে উপাসনার ক্ষেত্রে সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষার প্রচলনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান প্রবর্তক। শেষ বয়সে তিনি অনেকটা অজ্ঞাবাদী হয়ে পড়েন এবং প্রার্থনাদির প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করতেন না। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তিনি স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, হিন্দু বিধবাদের সমর্থন, বাল্যবিবাহ ও বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং নীলকর সাহেব ও জমিদারদের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে লেখালেখি করতেন। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে সমাজের কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে গঠিত ‘সমাজোন্নতিবিধায়িনী সুহৃৎসমিতি’,র সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।

তার রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূগোল, বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার, চারুপাঠ, ধর্মনীতি, পদার্থবিদ্যা, প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ইত্যাদি। তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’। এই বইয়ের দীর্ঘ উপক্রমণিকায় তিনি আর্যভাষা ও সাহিত্যের প্রধান তিনটি শাখা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রখ্যাত বাঙালি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন তার নাতি।