লাভ রানস ব্লাইন্ড বা সংক্ষেপে এলআরবি (LRB) বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সফল, জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তিতুল্য একটি রক ব্যান্ড। প্রখ্যাত মিউজিশিয়ান আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে ১৯৯১ সালে এই ব্যান্ডটি আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে হার্ড রক এবং ব্লুজ মিউজিককে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে এলআরবির অবদান অবিস্মরণীয়।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও নামকরণ
-
শুরুর কথা: সোলস ব্যান্ড ছাড়ার পর আইয়ুব বাচ্চু নিজের স্বাধীন মিউজিক করার তাগিদ থেকে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল নতুন এই ব্যান্ডটি গঠন করেন।
-
নামের পরিবর্তন: প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে ব্যান্ডটির নাম রাখা হয়েছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ (Little River Band)। কিন্তু কিছুকাল পর জানা যায় যে, অস্ট্রেলিয়ায় ঠিক একই নামে একটি বিখ্যাত ব্যান্ড আগে থেকেই রয়েছে। তখন আইয়ুব বাচ্চু ব্যান্ডের ইংরেজি আদ্যক্ষর (LRB) ঠিক রেখে এর নতুন নামকরণ করেন ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ (Love Runs Blind)।
-
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য: শুরুর দিকে এলআরবির মূল লাইনআপে ছিলেন,
-
আইয়ুব বাচ্চু (লিড ভোকাল ও লিড গিটার)
-
এস আই টুটুল (কিবোর্ড ও ব্যাকআপ ভোকাল)
-
সাইদুল হাসান স্বপন (বেজ গিটার)
-
হাবিব আনোয়ার জয় (ড্রামস)
-
প্রথম ডাবল অ্যালবাম ও ইতিহাস সৃষ্টি
ব্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় এলআরবি একটি যুগান্তকারী ইতিহাস তৈরি করে। ১৯৯২ সালে তারা বাংলাদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথমবারের মতো ডাবল অ্যালবাম রিলিজ করে। ‘এলআরবি ১’ এবং ‘এলআরবি ২’ নামের এই ক্যাসেট দুটি প্রকাশের সাথে সাথেই চারদিকে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয় এবং ব্যান্ডটি রাতারাতি তারকাখ্যাতি লাভ করে। এই অ্যালবামের ‘হকার’, ‘মাধবী’ এবং ‘ঘুমভাঙ্গা শহরে’ গানগুলো তখন তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
এলআরবির কালজয়ী সৃষ্টি
দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে এলআরবি অসংখ্য হিট অ্যালবাম এবং গান উপহার দিয়েছে। তাদের গানে প্রেমের বিরহ, একাকীত্ব, সামাজিক অসংগতি এবং জীবনের নানা দিক খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
-
উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম: সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের (১৯৯৮), বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩) ইত্যাদি।
-
জনপ্রিয় কিছু গান: চলো বদলে যাই (সেই তুমি), রূপালী গিটার, হাসতে দেখো গাইতে দেখো, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, এখন অনেক রাত, মন চাইলে মন পাবে, উড়াল দেবো আকাশে, এক আকাশ তারা ইত্যাদি।
আইয়ুব বাচ্চু পরবর্তী এলআরবি
এলআরবি এবং আইয়ুব বাচ্চু মূলত একে অপরের পরিপূরক ছিল। আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী গিটার প্লেয়িং এবং তার আবেগী কণ্ঠই ছিল এই ব্যান্ডের প্রাণ। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর আকস্মিক মৃত্যুতে এলআরবি তাদের অভিভাবক হারায়। তার মৃত্যুর পর ব্যান্ডের নাম এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে সদস্যদের মাঝে বেশ কিছু জটিলতা ও মতানৈক্য তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীতে বালামসহ কয়েকজন অতিথি ভোকালিস্টকে নিয়ে ব্যান্ডের পুরোনো সদস্যরা কিছু কনসার্ট করলেও, আইয়ুব বাচ্চুর সেই জাদুকরী উপস্থিতি ছাড়া এলআরবি আর কখনোই আগের রূপে ফিরতে পারেনি। তবে ব্যান্ডটির রেখে যাওয়া গানগুলো এবং তাদের সোনালি অতীত বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।