শেখ জয়নুদ্দিন

শেখ জয়নুদ্দিন (Sheikh Zainuddin) ছিলেন কোম্পানি আমলের (অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রশিল্পী। তিনি ইউরোপীয় শিল্পীদের অধীনে কাজ করে খ্যাতি অর্জন করা স্থানীয় শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের স্ত্রী লেডি ইম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি বিশেষ পরিচিতি পান।

নিচে তার জীবন ও কর্মের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত বাংলা আলোচনা তুলে ধরা হলো:

শিল্পজীবন ও পরিচিতি

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে লেডি ইম্পে তার ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার পশু-পাখির বাস্তবসম্মত ছবি আঁকানোর জন্য পাটনা থেকে তিন জন বিশিষ্ট শিল্পীকে নিয়ে এসেছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে শেখ জয়নুদ্দিন ছিলেন সর্বাগ্রগণ্য। তৎকালীন সময়ে কারয়ার শেখ মুহাম্মদ আমিরের পরেই তাকে স্থান দেওয়া হয়।

শৈলী ও কৌশল

জয়নুদ্দিনের শিল্পকর্মের মধ্যে মুঘল ও ইউরোপীয় শৈলীর এক চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়:

  • মুঘল পাটনা কলম: তিনি মূলত তৎকালীন মুঘল ‘পাটনা কলম’ (Patna Qalam) বা মুঘল ঘরানার চিত্রশৈলীতে অভ্যস্ত ছিলেন।

  • ইউরোপীয় প্রভাব: জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষক ও শিল্পীদের সান্নিধ্যে আসার পর তিনি ইউরোপীয় চিত্রশৈলী ও কৌশলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন। তার চিত্রকর্মে মুঘল ধারার নিখুঁত চারুকলা এবং ইউরোপীয় বাস্তববাদের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।

  • কৌশল: তিনি সাধারণত ১৭৭৭ থেকে ১৭৮২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে তৈরি ‘হোয়াইটম্যান আর্ট পেপার’-এ স্বচ্ছ জলরঙে স্কেচ করতেন। তার সূক্ষ্ম তুলির টানে আঁকা ছবিগুলোতে মুঘল দরবারের বিখ্যাত শিল্পী ওস্তাদ মনসুরের কাজের ছাপ পরিলক্ষিত হয়।

উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম

তিনি পাখি ও প্রাণীর নিখুঁত স্কেচ তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তার আঁকা বিভিন্ন ছবি যেমন—মাউন্টেন র‍্যাট (পাহাড়ি ইঁদুর), ঝুলে থাকা বাদুড়, তোতা পাখি, বক ইত্যাদির স্কেচগুলো প্রাণিবিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণার পাশাপাশি নান্দনিকতার দিক থেকেও অত্যন্ত উচ্চমানের।

বর্তমানে তার আঁকা শিল্পকর্মগুলোর একটি বড় অংশ অক্সফোর্ডের অশমোলিয়ান মিউজিয়ামে (Ashmolean Museum) সংরক্ষিত রয়েছে। শেখ জয়নুদ্দিনের শিল্পকর্ম কোম্পানি আমলের ভারত-ইউরোপীয় শৈলীর সংমিশ্রণ ও সৃজনশীলতার এক অনন্য দলিল হিসেবে আজও বিবেচিত হয়।