মহারাজা নন্দকুমার (জন্ম: ১৭০৫? – মৃত্যু: ৫ আগস্ট, ১৭৭৫) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার, দেওয়ান এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক শাসনকালে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রবল। তবে ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন ওয়ারেন হেস্টিংসের চক্রান্তে এক প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে তাঁর মর্মান্তিক ফাঁসির ঘটনার জন্য, যাকে ঐতিহাসিকরা ‘বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড’ (Judicial Murder) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
রাজনৈতিক উত্থান ও প্রভাব
নন্দকুমার ছিলেন একজন উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে তিনি তৎকালীন বাংলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন:
-
ফৌজদার ও দেওয়ান: তিনি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার আমলে হুগলির ফৌজদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মীর জাফর এবং ব্রিটিশ কোম্পানির অধীনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব পদে (দেওয়ান) অধিষ্ঠিত ছিলেন।
-
‘মহারাজা’ উপাধি: মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৪ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ‘মহারাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। রবার্ট ক্লাইভ তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ নিতেন।
ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে সংঘাত
ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর হয়ে আসার পর থেকেই নন্দকুমারের সাথে তাঁর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
-
দুর্নীতির অভিযোগ: ১৭৭৫ সালে নন্দকুমার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলে (Supreme Council) দুর্নীতির এক গুরুতর অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন যে, হেস্টিংস নবাব মীর জাফরের বিধবা স্ত্রী মুন্নি বেগমকে নাবালক নবাবের অভিভাবক নিযুক্ত করার বিনিময়ে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
-
কাউন্সিলের সমর্থন: হেস্টিংসের বিরোধী কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য (যেমন: ফিলিপ ফ্রান্সিস) নন্দকুমারের অভিযোগকে সমর্থন করেন এবং হেস্টিংসকে এই অর্থ কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন, যা হেস্টিংসের জন্য চরম অপমানজনক ছিল।
জালিয়াতির মামলা ও প্রহসনের বিচার
এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে হেস্টিংস অত্যন্ত চতুর ও নির্মম পথ বেছে নেন।
-
ষড়যন্ত্র: হেস্টিংসের প্রত্যক্ষ মদদে মোহন প্রসাদ নামক এক ব্যক্তি নন্দকুমারের বিরুদ্ধে একটি পুরোনো দলিলের ওপর ভিত্তি করে জালিয়াতির (Forgery) মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ করা হয় যে, নন্দকুমার ১৭৬৯ সালে বুলাকি দাস নামক এক শেঠের স্বাক্ষরিত একটি বন্ড জাল করেছিলেন।
-
সুপ্রিম কোর্টে বিচার: মামলাটি নবগঠিত সুপ্রিম কোর্টে ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এলাইজা ইম্পে (Sir Elijah Impey) ছিলেন হেস্টিংসের বাল্যবন্ধু। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ একপেশে। ব্রিটিশ আইন (যা তখন পর্যন্ত ভারতীয়দের ওপর সেভাবে প্রয়োগ করা হয়নি) জোরপূর্বক নন্দকুমারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ফাঁসি ও বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড
মাত্র আট দিন বিচার চলার পর, জুড়িদের সিদ্ধান্তে নন্দকুমারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী তাঁকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) দেওয়া হয়।
-
১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট কলকাতার খিদিরপুর সংলগ্ন কুলি বাজারে (বর্তমান হেস্টিংস এলাকা) মহারাজা নন্দকুমারকে জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়।
-
এই ঘটনা তৎকালীন হিন্দু সমাজে এবং বাংলার সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি করেছিল। অনেক ব্রাহ্মণ ভয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
নন্দকুমারের ফাঁসি ইতিহাসে কেবল একটি মৃত্যুদণ্ড ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত।
-
ঐতিহাসিক লর্ড মেকলে (Lord Macaulay) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই ঘটনাকে ‘Judicial Murder’ বা বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড বলে সমালোচনা করেছিলেন।
-
নন্দকুমারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি ভারতীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ ছিল না। তদুপরি, যে সময়ের অপরাধ দাবি করা হয়েছিল, তখন কলকাতায় ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের অস্তিত্বই ছিল না।
-
এই ঘটনা ব্রিটিশদের মনে স্বস্তি দিলেও হেস্টিংসের সুনামে বড় কালিমা লেপন করে। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে ওয়ারেন হেস্টিংস এবং স্যার এলাইজা ইম্পের বিরুদ্ধে যখন ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন নন্দকুমারকে অন্যায়ভাবে হত্যার বিষয়টি অন্যতম প্রধান অভিযোগ হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল।