ব্রাহ্মণ

প্রাচীন ভারতের হিন্দু সমাজব্যবস্থা বা বর্ণাশ্রম ধর্মের চারটি প্রধান বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) মধ্যে সর্বোচ্চ এবং প্রথম বর্ণটি হলো ‘ব্রাহ্মণ’। সংস্কৃত ‘ব্রহ্ম’ (যার অর্থ পরম সত্য, বেদ বা পবিত্র জ্ঞান) শব্দ থেকে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দের উৎপত্তি। ঋগ্বেদের ‘পুরুষসূক্ত’ অনুযায়ী, আদি পুরুষ বা পরম সত্তার মুখ থেকে ব্রাহ্মণদের উৎপত্তি হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে তাঁরা ছিলেন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় রীতিনীতির প্রধান ধারক ও বাহক।

ঐতিহ্যগত পেশা ও দায়িত্ব প্রাচীন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র (যেমন— মনুস্মৃতি) অনুযায়ী, ব্রাহ্মণদের মূলত ছয়টি প্রধান কর্ম বা দায়িত্ব (ষটকর্ম) নির্ধারণ করা হয়েছিল:

  • পঠন ও পাঠন: পবিত্র বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করা এবং অন্যদের শিক্ষাদান করা।

  • যজন ও যাজন: নিজে ধর্মীয় যজ্ঞ বা পূজা করা এবং সমাজের অন্যদের হয়ে যজ্ঞ পরিচালনা বা পৌরোহিত্য করা।

  • দান ও প্রতিগ্রহ: সৎ উদ্দেশ্যে দান করা এবং ধর্মীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দান গ্রহণ করা।

প্রাচীন সমাজে তাঁরা মূলত পুরোহিত, শিক্ষক, পণ্ডিত, দার্শনিক এবং রাজাদের প্রধান উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাচীন ভারতের দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সংস্কৃত ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশে তাঁদের অবদান অপরিসীম।

বাংলার ইতিহাসে ব্রাহ্মণ সমাজ

বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্রাহ্মণদের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থান রয়েছে। পাল যুগের বৌদ্ধ প্রভাবের পর সেন রাজবংশের (বিশেষ করে রাজা বল্লাল সেনের) শাসনামলে বাংলায় হিন্দু ধর্মকে পুনর্গঠিত করার লক্ষ্যে ‘কৌলীন্য প্রথা’ প্রবর্তন করা হয়। এই প্রথার মাধ্যমে বাংলার ব্রাহ্মণদের তাঁদের বিদ্যা, নিষ্ঠা, আচার ও সৎচরিত্রের ভিত্তিতে রাঢ়ী, বারেন্দ্র এবং বৈদিক— এমন বিভিন্ন শ্রেণিতে এবং ‘কুলীন’ মর্যাদায় বিভক্ত করা হয়েছিল। সেন যুগে সমাজ পরিচালনায় এবং শাস্ত্রীয় বিধান প্রণয়নে (যেমন— বল্লাল সেনের গুরু অনিরুদ্ধ ভাট্ট) ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আধুনিক প্রেক্ষাপট

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্রাহ্মণদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, রীতিনীতি এবং পেশায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণে (যেমন— রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর) ব্রাহ্মণ সমাজের প্রগতিশীল চিন্তাবিদরাই সমাজ সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমান আধুনিক যুগে তাঁরা ঐতিহ্যবাহী পৌরোহিত্য বা শাস্ত্রচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে প্রশাসন, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, সাহিত্যসহ আধুনিক সকল পেশাতেই যুক্ত রয়েছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় (যেমন— ভারত বা বাংলাদেশ) জাতিভেদ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ ও বৈষম্যমূলক হলেও, একটি ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে হিন্দু সমাজে আজও ব্রাহ্মণদের একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রয়েছে।