শাহ সুজা (১৬১৬-১৬৬১) ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী সম্রাট শাহজাহান এবং সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের দ্বিতীয় পুত্র। লোককথা ও স্থানীয় ইতিহাসে তাঁকে অনেক সময় ‘সম্রাট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, তিনি মূলত ছিলেন সুবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার বা শাসনকর্তা। তবে ১৬৫৭ সালে সম্রাট শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে ভাইদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয়, সেই উত্তাল সময়ে তিনি নিজেকে স্বাধীন মুঘল সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
বাংলার সুবেদার হিসেবে শাসনকাল
১৬৩৯ সালে শাহ সুজা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ ও সফল শাসনকালে তিনি সুবে বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছিলেন। শাসনকার্যের সুবিধার্থে তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে রাজমহলে (আকবরনগর) স্থানান্তর করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ঢাকায় নির্মিত ঐতিহাসিক ‘বড় কাটরা’ তাঁর শাসনকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন, যা মূলত তাঁর নিজের বসবাসের জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিল।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ ও ডুলাহাজারা
সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার পর সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে শাহ সুজা তাঁর ভাই আওরঙ্গজেবের সুযোগ্য সেনাপতি মীর জুমলার বাহিনীর কাছে ১৬৫৯ সালে খজুয়ার যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। প্রাণরক্ষার তাগিদে তিনি সপরিবারে আরাকান রাজ্যের (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য) দিকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হন। আরাকান যাওয়ার পথে তিনি চট্টগ্রাম ও বর্তমান কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করেন। ঐতিহাসিক লোককথা অনুযায়ী, কক্সবাজারের চকরিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি সেখানে ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং তাঁর যাত্রাবহরের প্রায় এক হাজার পালঙ্কী সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। এই হাজার পালঙ্কীর অবস্থান থেকেই ওই স্থানটির নাম ‘ডুলাহাজারা’ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
আরাকানে আশ্রয় ও মর্মান্তিক পরিণতি
মীর জুমলার বাহিনীর তাড়া খেয়ে ১৬৬০ সালে শাহ সুজা নাফ নদী পার হয়ে আরাকানে প্রবেশ করেন এবং তৎকালীন আরাকান রাজা সান্ডা সুধম্মার কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। প্রথমদিকে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করা হলেও, পরবর্তীতে সুজার বিপুল ধনসম্পদ এবং তাঁর রূপবতী কন্যাকে আরাকান রাজার বিবাহের অন্যায্য প্রস্তাব ঘিরে উভয়ের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এই বিরোধের জের ধরে ১৬৬১ সালে আরাকান রাজার নির্দেশে শাহ সুজা এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ঐতিহাসিক প্রভাব
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে শাহ সুজার পতন ও মর্মান্তিক মৃত্যু একটি অত্যন্ত করুণ ও বিয়োগান্তক অধ্যায়। তবে বাংলার সুবেদার হিসেবে তাঁর দীর্ঘ শাসনকাল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সময়ে বাংলার সাথে ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং তিনি জ্ঞানীগুণীদের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বাংলার স্থাপত্য এবং বিশেষ করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের স্থানীয় ইতিহাসে তাঁর এই ঐতিহাসিক যাত্রার স্মৃতি আজও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।