আইয়ুব বাচ্চু

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে আইয়ুব বাচ্চু এমন একটি নাম, যা কেবল একজন শিল্পীর পরিচয় বহন করে না, বরং এটি একটি যুগের, একটি অনুভূতির এবং একটি বিপ্লবের সমার্থক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন দুর্দান্ত গায়ক, কিংবদন্তিতুল্য লিড গিটারিস্ট, প্রতিভাবান গীতিকার এবং সুরকার। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। ভক্তদের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধায় ‘বস্’ নামে পরিচিত। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের রক এবং ব্লুজ মিউজিক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

জন্ম ও শৈশব, সংগীতের প্রতি অনুরাগের শুরু

আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট, চট্টগ্রাম শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার ডাকনাম ছিল রবিন। ছোটবেলা থেকেই তিনি চট্টগ্রামের আলো-বাতাসে বড় হয়েছেন। তার পরিবারের সংগীতের কোনো বিশেষ পটভূমি ছিল না, বরং পরিবার চেয়েছিল তিনি পড়াশোনা করে সাধারণ আর দশজনের মতো জীবনযাপন করবেন। কিন্তু তার মন পড়ে থাকত সুর আর বাদ্যযন্ত্রের মাঝে। খুব অল্প বয়সেই তিনি গিটারের প্রেমে পড়েন।

সেই সময় চট্টগ্রামে বিদেশি ব্যান্ডের ক্যাসেট পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। তবুও তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে কিম্বা অনেক কষ্টে জোগাড় করে জিমি হেনড্রিক্স, জো স্যাটরিয়ানি, ডিপ পার্পল, এরিক ক্ল্যাপটন এবং কার্লোস সান্তানার মতো বিশ্বখ্যাত গিটারিস্টদের গান শুনতেন। এই মানুষগুলোই তার সংগীত জীবনের প্রথম দিককার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। পরিবার থেকে প্রথমদিকে গিটার বাজানো বা ব্যান্ডের সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি ভালোভাবে মেনে নেওয়া হয়নি। কিন্তু সংগীতের প্রতি তার তীব্র আবেগ এবং জেদ তাকে এই পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি।

সংগীত জীবনের প্রথম ধাপ, ফিলিংস ও সোলস

আইয়ুব বাচ্চুর আনুষ্ঠানিক সংগীত জীবন শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। ওই বছর তিনি চট্টগ্রামের স্থানীয় ব্যান্ড ‘ফিলিংস’ এর সাথে যুক্ত হন। ফিলিংসের সাথে তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেল, ক্লাব এবং কনসার্টে গান পরিবেশন করতেন। সেই সময়ে তার গিটার বাজানোর দক্ষতা স্থানীয় শ্রোতাদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং পুরনো ব্যান্ড ‘সোলস’,এ (Souls) লিড গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন। সোলস,এ তার যোগদান ছিল তার ক্যারিয়ারের একটি বড় মোড়। সোলসের সাথে তিনি দীর্ঘ ১০ বছর কাজ করেন। এই সময়ে সোলসের চারটি অ্যালবামে তিনি কাজ করেছিলেন, যেগুলোর মধ্যে ‘সুপার সোলস’, ‘কলেজের করিডোরে’, ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ এবং ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ অন্যতম। সোলস মূলত একটি পপ ঘরানার ব্যান্ড ছিল, কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের রিফ এবং সলো বাজানোর স্টাইল ব্যান্ডটির গানে এক নতুন রক স্বাদ যুক্ত করেছিল। সোলসের সাথে থাকাকালীনই তিনি বুঝতে পারেন যে তার নিজের ভেতরের মিউজিক আরও অনেক বেশি রক এবং ব্লুজ কেন্দ্রিক। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নতুন কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন।

এলআরবি (LRB) গঠন, বাংলা ব্যান্ড সংগীতে নতুন যুগের সূচনা

১৯৯০ সালের শেষের দিকে আইয়ুব বাচ্চু সোলস থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল তার নিজস্ব ব্যান্ড ‘এলআরবি’ গঠন করেন। প্রথমে এই ব্যান্ডের নাম রাখা হয়েছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, কিন্তু পরে তা পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ (Love Runs Blind)। তার সাথে এই ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন জয়, স্বপন এবং এস আই টুটুল।

আরো পড়ুন:  মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ

এলআরবি বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা জন্ম দেয়। ১৯৯২ সালে তারা বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম ‘এলআরবি ১’ এবং ‘এলআরবি ২’ রিলিজ করে। এই অ্যালবামের ‘হকার’, ‘মাধবী’, ‘ঘুমভাঙ্গা শহরে’, ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’ গানগুলো রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এলআরবি প্রমাণ করে দেয় যে বাংলা গানে হার্ড রক এবং ব্লুজ মিউজিকের দারুণ এক সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী ভয়েস এবং তার গিটারের তীক্ষ্ণ সুর শ্রোতাদের একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলে।

এলআরবি,এর কালজয়ী সব অ্যালবাম ও গান

এলআরবি,এর ক্যারিয়ারে তারা অসংখ্য জনপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দিয়েছে, যা প্রতিটি প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।

  • সুখ (১৯৯৩): এই অ্যালবামের ‘চলো বদলে যাই’ (যা ‘সেই তুমি’ নামে বেশি পরিচিত) গানটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং জনপ্রিয় গান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গানটি শোনেননি বা গানটির সুর গুনগুন করেননি, বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। একই অ্যালবামের ‘রূপালী গিটার’ গানটি তার নিজের জীবনের যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

  • তবুও (১৯৯৪): এই অ্যালবামে এলআরবি তাদের রক ধারাকে আরও জোরালো করে।

  • ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫): ‘ঘুমন্ত শহরে’ অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাকটি শ্রোতাদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

  • স্বপ্ন (১৯৯৬): এই অ্যালবামের গানগুলোতে জীবনের নানা হতাশা, প্রেম এবং স্বপ্নের কথা খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • আমাদের (১৯৯৮), বিস্ময় (১৯৯৮) এবং অন্যান্য: এরপর একে একে ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মনে আছে নাকি নাই’, ‘স্পর্শ’ এবং ‘যুদ্ধ’,এর মতো চমৎকার সব অ্যালবাম তারা রিলিজ করে।

প্রতিটি অ্যালবামে আইয়ুব বাচ্চু সুর, লিরিক্স এবং গিটারে নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। তার গানগুলোতে শুধু প্রেমের কথাই থাকত না, বরং সেখানে থাকত জীবনের গভীর হতাশা, একাকীত্ব, সমাজের প্রতি ক্ষোভ এবং আত্মোপলব্ধির কথা।

সফল সলো ক্যারিয়ার

ব্যান্ডের বাইরেও আইয়ুব বাচ্চু একজন অত্যন্ত সফল সলো আর্টিস্ট ছিলেন। ১৯৮৬ সালে সোলস,এ থাকাকালীন অবস্থাতেই তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’ রিলিজ হয়। তবে তার সলো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্রেক থ্রু আসে ১৯৮৮ সালে রিলিজ হওয়া ‘ময়না’ অ্যালবামের মাধ্যমে।

এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি ‘কষ্ট’ নামের একটি সলো অ্যালবাম রিলিজ করেন, যা বাংলা অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে বিক্রির সকল রেকর্ড ভেঙে দেয়। ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘অবাক হৃদয়’ গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। তার ভয়েসের যে একটা অদ্ভুত কষ্ট বা বিরহ ছিল, তা এই অ্যালবামের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে।

তার অন্যান্য জনপ্রিয় সলো অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘সময়’ (১৯৯৮), ‘একা’ (১৯৯৯), ‘প্রেম তুমি কি’ (২০০২), ‘দুটি মন’ (২০০২), ‘কাফেলা’ (২০০২) এবং ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (২০০৮)। তিনি বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামেও কাজ করেছেন এবং নতুন অনেক শিল্পীকে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।

আরো পড়ুন:  ওয়ালি খান মসজিদ

চলচ্চিত্রের গানে বিপ্লব (প্লেব্যাক)

বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন ব্যান্ডের শিল্পীরা চলচ্চিত্রের গানে খুব একটা কণ্ঠ দিতেন না। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু সেই প্রথা ভেঙে দেন। তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রের গানে প্লেব্যাক করেন এবং সেই গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় প্লেব্যাকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘আম্মাজান’ সিনেমার টাইটেল ট্র্যাক ‘আম্মাজান আম্মাজান’। এই গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, এটি বাংলাদেশের পথে-ঘাটে সব জায়গায় বাজতে শোনা যেত। এছাড়াও ‘সাগরিকা’ সিনেমার ‘আকাশ কেঁদেছে বাতাস কেঁদেছে’, ‘ব্যাচেলর’ সিনেমার ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’, ‘লুটতরাজ’ সিনেমার ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ গানগুলো তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ারের অনবদ্য সৃষ্টি। চলচ্চিত্রের গানে তিনি এমন এক স্টাইল নিয়ে এসেছিলেন, যা সাধারণ দর্শক এবং ব্যান্ডের শ্রোতা, উভয়কেই আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।

গিটার বাদন শৈলী, ব্লুজ ও ইনস্ট্রুমেন্টাল

আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘গিটার গড’। তাকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট এবং উপমহাদেশে ব্লুজ মিউজিকের অন্যতম প্রবর্তক বলা হয়। গিটারের স্ট্রিংয়ে তার আঙুল চলত জাদুর মতো। কনসার্টে যখন তিনি চোখ বন্ধ করে গিটার সলো বাজাতেন, তখন পুরো দর্শক সারি নিস্তব্ধ হয়ে সেই সুর উপভোগ করত।

জিমি হেনড্রিক্স এবং জো স্যাটরিয়ানির স্টাইল থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তিনি গিটার বাজানোতে নিজস্ব এক সিগনেচার স্টাইল তৈরি করেছিলেন। ব্লুজ স্কেলে তার বাজানো মেলোডিগুলোতে এক ধরনের অদ্ভুত বিষাদ এবং আবেদন থাকত। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের গিটার ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে আইবানেজ, ফেন্ডার স্ট্র্যাটোকাস্টার, কারভিন এবং গিবসন অন্যতম।

২০০৭ সালে তিনি ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ (Sound of Silence) নামে একটি ইনস্ট্রুমেন্টাল অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এক সাহসী পদক্ষেপ। গিটারের মাধ্যমে কীভাবে মানুষের মনের কথা বলা যায়, তা তিনি এই অ্যালবামের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন।

লাইভ কনসার্ট এবং স্টেজ পারফরম্যান্স

স্টেজে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন এক অদম্য প্রাণশক্তি। লাইভ কনসার্টে তার এনার্জি ছিল দেখার মতো। গিটার বাজাতে বাজাতে স্টেজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো, দর্শকদের সাথে সরাসরি কথা বলা এবং তাদের গান গাইতে উদ্বুদ্ধ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তার ছিল।

তিনি দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য ওপেন এয়ার কনসার্টে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তিনি এলআরবি,কে নিয়ে সফল ট্যুর করেছেন। আনপ্লাগড (Unplugged) শো,গুলোতে অ্যাকোস্টিক গিটার হাতে তার পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত রিফ্রেশিং এবং শ্রোতাদের কাছে পরম আরাধ্য। বামবা,র (BAMBA, Bangladesh Musical Bands Association) নেতৃত্বে দেশের ব্যান্ড মিউজিককে এগিয়ে নিতে তিনি সবসময় সামনের সারিতে থাকতেন।

তরুণ প্রজন্মের মেন্টর এবং এবি লাউঞ্জ

আইয়ুব বাচ্চু সবসময় তরুণ শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তার গিটার বাজানো দেখে বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ গিটার হাতে তুলে নিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তরুণরাই ব্যান্ডের ভবিষ্যৎ। নতুন ব্যান্ডগুলোকে তিনি সবসময় সাপোর্ট করতেন এবং তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে গাইড করতেন।

আরো পড়ুন:  রেনেসাঁ

তিনি ‘এবি লাউঞ্জ’ (AB Lounge) এবং ‘এবি কিচেন’ (AB Kitchen) নামে নিজস্ব স্টুডিও এবং প্রোডাকশন হাউস তৈরি করেছিলেন। এখান থেকে তিনি অনেক নতুন প্রতিভাবান শিল্পীর অ্যালবাম প্রযোজনা করেছেন এবং তাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে শক্ত অবস্থান তৈরিতে সাহায্য করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও দর্শন

ব্যক্তিগত জীবনে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এবং মাটির কাছের একজন মানুষ। তিনি সবসময় কালো রঙের টি-শার্ট এবং মাথায় ক্যাপ বা হ্যাট পরতে ভালোবাসতেন, যা তার ট্রেডমার্ক স্টাইলে পরিণত হয়েছিল। তার গানের লিরিক্সে প্রায়ই জীবনের শূন্যতা, ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি এবং মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা ফুটে উঠত।

তিনি তার মাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। তার মা যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েছিলেন। তার বিখ্যাত ‘রূপালী গিটার’ গানে তিনি বলেছিলেন, “এই রূপালী গিটার ফেলে, একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে”। এই লাইনগুলো যেন তার নিজের জীবনেরই এক আগাম বার্তা ছিল। পরিবার বলতে তার স্ত্রী চন্দনা, ছেলে আহনাফ তাজওয়ার এবং মেয়ে ফাইরুজ সাফরা,কে নিয়েই ছিল তার পৃথিবী।

চিরপ্রস্থান ও শেষ বিদায়

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সকালে এক আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। সেদিন সকালে নিজ বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেল, সর্বত্রই মানুষের কান্নার রোল পড়ে যায়। সাধারণ ভক্ত থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর, তাকে তার জন্মস্থান চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চৈতন্য গলি কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশেই তাকে চিরনিন্দ্রায় শায়িত করা হয়।

উপসংহার

আইয়ুব বাচ্চু আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া গান এবং সুর অনন্তকাল ধরে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে তার স্মৃতি রক্ষার্থে একটি বিশাল ‘রূপালী গিটার’ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় এই শহরেই জন্মেছিলেন বাংলা রক মিউজিকের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। যতদিন বাংলা গান থাকবে, যতদিন কোনো তরুণ তার বুকে গিটার আঁকড়ে ধরবে, ততদিন আইয়ুব বাচ্চু তার রূপালী গিটারের ঝংকারে আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন।