‘তৃতীয় বিশ্ব’ (Third World) বলতে মূলত স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের সময়কালে উদ্ভূত একটি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারণাকে বোঝায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যখন পুঁজিবাদী ‘প্রথম বিশ্ব’ (যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশসমূহ) এবং সমাজতান্ত্রিক ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ (সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র দেশসমূহ), এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন যে দেশগুলো এই দুই শিবিরের কোনোটিতেই সরাসরি যোগ না দিয়ে জোটনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তাদেরকে সম্মিলিতভাবে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফরাসি জনতাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড সভি (Alfred Sauvy) ১৯৫২ সালে সর্বপ্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। ফরাসি বিপ্লবের সময়কার ‘থার্ড এস্টেট’ বা সাধারণ মানুষের সাথে তুলনা করে তিনি এই ধারণাটির অবতারণা করেছিলেন, যারা রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত হলেও সংখ্যায় ছিল গরিষ্ঠ।
ভৌগোলিকভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো প্রধানত এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। এসব দেশের বেশিরভাগই একসময় বিভিন্ন পরাশক্তির ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে ছিল এবং বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্বাধীনতা লাভ করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের দিক থেকে ঐতিহাসিকভাবে এই দেশগুলোর বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, মাথাপিছু আয়ের নিম্ন হার, উচ্চ দারিদ্র্যসীমা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, অনুন্নত শিল্প খাত, শিক্ষার নিম্ন হার এবং দুর্বল অবকাঠামো। তবে সময়ের সাথে সাথে এই দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; ভারত, ব্রাজিল বা মেক্সিকোর মতো কিছু দেশ দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, অন্যদিকে অনেক দেশ এখনো চরম দারিদ্র্য, অনুন্নয়ন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’ (Non-Aligned Movement বা NAM) গঠন করে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রার যোগ করেছিল। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ‘প্রথম’ ও ‘দ্বিতীয়’ বিশ্বের মধ্যকার বিভাজন বিলুপ্ত হওয়ায় ‘তৃতীয় বিশ্ব’ ধারণাটি তার মূল রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দটি বেশ সেকেলে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অবমাননাকর বা নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পরিবর্তে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাস্তবতাকে এবং এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক যাত্রাকে আরও নিখুঁতভাবে তুলে ধরার জন্য বর্তমানে ‘উন্নয়নশীল দেশ’ (Developing Countries), ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (Least Developed Countries বা LDC) অথবা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গ্লোবাল সাউথ’ (Global South)-এর মতো পরিভাষাগুলোর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক সমাদৃত।