আলফ্রেড সভি (৩১ অক্টোবর ১৮৯৮ – ৩০ অক্টোবর ১৯৯০) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফরাসি জনতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ। আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে তাঁকে মূলত ‘তৃতীয় বিশ্ব’ (Third World বা ফরাসি পরিভাষায় Tiers Monde) ধারণাটির প্রবর্তক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্মরণ করা হয়। জনসংখ্যাবিদ্যা ও অর্থনীতির ওপর গভীর বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী সভি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাদৃত।
১৯৫২ সালের ১৪ আগস্ট ফরাসি সাময়িকী ‘ল্য অবজারভেতর’ (L’Observateur)-এ প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ত্রোয়া মঁদ, উ্যন প্লানেট” (Trois mondes, une planète বা তিনটি বিশ্ব, একটি গ্রহ)-এ তিনি সর্বপ্রথম ‘তৃতীয় বিশ্ব’ পরিভাষাটির অবতারণা করেন। ফরাসি বিপ্লবের সময়কার রাজনৈতিক কাঠামো ‘থার্ড এস্টেট’ (Tiers État) বা সাধারণ মানুষের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি এই ধারণাটি তৈরি করেছিলেন। সভি তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার পুঁজিবাদী ‘প্রথম বিশ্ব’ এবং সমাজতান্ত্রিক ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’-এর দ্বন্দ্বের বাইরে থাকা দেশগুলো অবহেলিত ও শোষিত হলেও, জনসংখ্যার বিচারে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফরাসি বিপ্লবের তৃতীয় এস্টেটের মতো এই তৃতীয় বিশ্বও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট।
পরিভাষা উদ্ভাবনের বাইরেও আলফ্রেড সভি জনমিতি বা জনসংখ্যাবিজ্ঞান (Demography) শাখায় যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তিনি ফ্রান্সের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক স্টাডিজ’ (INED)-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ১৯৪৫ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়। কর্মজীবনে তিনি জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।
সভি জাতিসংঘের জনসংখ্যা কমিশনেরও প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যা নীতির রূপরেখা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর লেখা অসংখ্য গ্রন্থ ও প্রবন্ধ আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, জনমিতি এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসে আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। মূলত জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতি কীভাবে একটি জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আলফ্রেড সভি অতুলনীয় মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।