প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বিখ্যাত কেন্দ্র ছিল ‘বিক্রমশীল মহাবিহার’ (বা বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয়)। নালন্দা মহাবিহারের পর এটিই ছিল তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে বা নবম শতাব্দীর শুরুতে প্রাচীন বাংলার পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক সম্রাট ধর্মপাল এই মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলার অন্তিচক (Antichak) গ্রামে গঙ্গা নদীর তীরে এই সুবিশাল শিক্ষাকেন্দ্রটি অবস্থিত ছিল।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম
-
তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র: বিক্রমশীল মহাবিহার মূলত বৌদ্ধ ধর্মের ‘বজ্রযান’ বা তান্ত্রিক শাখার অধ্যয়নের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সমগ্র এশিয়ায় খ্যাতি লাভ করেছিল।
-
পাঠ্যবিষয়: এখানে কেবল ধর্মতত্ত্বই নয়, বরং ন্যায়শাস্ত্র (Logic), দর্শন, ব্যাকরণ, অধিবিদ্যা (Metaphysics) এবং চিকিৎসাবিদ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও উচ্চতর শিক্ষা প্রদান করা হতো।
-
উপাধি প্রদান: শিক্ষা সমাপ্ত করার পর যোগ্য ও কৃতী শিক্ষার্থীদের এই মহাবিহার থেকে ‘পণ্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করা হতো, যা তৎকালীন সমাজে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ছিল।
বিখ্যাত পণ্ডিত ও অতীশ দীপঙ্কর
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক আবাসিক শিক্ষক এবং হাজার হাজার দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করতেন। তিব্বত থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী এখানে জ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। এই মহাবিহারের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষু অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তিনি একাদশ শতাব্দীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাস্থবির বা আচার্য (উপাচার্য বা প্রধান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীকালে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার সাধনে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন।
স্থাপত্যশৈলী
বিক্রমশীলার স্থাপত্য ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং দুর্গের মতো সুরক্ষিত। এর চারপাশে একটি সুউচ্চ ও মজবুত প্রাচীর ছিল। মহাবিহারের ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটি সুবিশাল ও সুদৃশ্য বৌদ্ধ স্তূপ (Stupa) বা প্রধান মন্দির ছিল, যাকে ঘিরে চারদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০৮টি আবাসিক কক্ষ বা মঠ নির্মিত হয়েছিল।
পতন ও ধ্বংস
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিক্রমশীল মহাবিহার প্রায় চারশো বছর ধরে তার গৌরবময় অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। কিন্তু ১১৯৩ থেকে ১২০৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি যখন বিহার আক্রমণ করেন, তখন এর মজবুত প্রাচীর ও সুবিশাল কাঠামো দেখে তিনি এটিকে একটি সামরিক দুর্গ (Fortress) বলে ভুল করেন। তাঁর বাহিনীর নির্মম আক্রমণে এই জ্ঞানপীঠ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, এর আবাসিক ভিক্ষুদের হত্যা করা হয় এবং গ্রন্থাগারের হাজার হাজার অমূল্য পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।
উপসংহার
প্রাচীন বাংলার পাল রাজাদের অসামান্য বিদ্যানুরাগ এবং পৃষ্ঠপোষকতার এক অমর কীর্তি হলো এই বিক্রমশীল মহাবিহার। যদিও তুর্কি আক্রমণে এর বাহ্যিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিব্বতীয় সাহিত্য ও প্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাসে এই বিদ্যাপীঠের জ্ঞানচর্চার গৌরবময় ইতিহাস আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। প্রাচীন ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা অনুধাবনের ক্ষেত্রে নালন্দার পাশাপাশি বিক্রমশীলার নামও সগৌরবে উচ্চারিত হয়।