প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের এক অসামান্য নিদর্শন হলো ‘সোমপুর মহাবিহার’, যা বর্তমানে ‘পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার’ নামেই বেশি পরিচিত। এটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর নামক গ্রামে অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে বা নবম শতাব্দীর শুরুতে প্রাচীন বাংলার পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক সম্রাট ধর্মপাল এই সুবিশাল মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো এটিও ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুবৃহৎ আবাসিক বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র।
স্থাপত্যশৈলী ও গঠন
সোমপুর মহাবিহারের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং প্রাচীন এশিয়ার অন্যতম বিস্ময়।
-
আবাসিক কাঠামো: বিহারটি একটি সুবিশাল চতুষ্কোণাকার প্রাঙ্গণ জুড়ে অবস্থিত, যার চারদিক ঘিরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাসের এবং ধর্মচর্চার জন্য মোট ১৭৭টি কক্ষ বা মঠ নির্মিত হয়েছিল।
-
কেন্দ্রীয় মন্দির: এই বিশাল বিহারের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি সুউচ্চ ও ক্রুশাকার (Cruciform) বা ক্রুশ আকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দির, যার স্থাপত্যশৈলী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক মন্দিরকে (যেমন— মিয়ানমারের প্যাগোডা বা ইন্দোনেশিয়ার প্রাম্বানান) প্রভাবিত করেছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
-
টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক: মন্দিরের বাইরের দেয়ালগুলো অসংখ্য চমৎকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সজ্জিত। এসব ফলকে কেবল ধর্মীয় দেব-দেবীই নয়, বরং প্রাচীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পশুপাখি, সঙ্গীত, নৃত্য ও লোকায়ত সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৪০০ বছর ধরে সোমপুর মহাবিহার বৌদ্ধ ধর্মের জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় অনুবাদের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। তিব্বত, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তীর্থযাত্রী এখানে আসতেন। তিব্বতীয় সূত্র থেকে জানা যায়, বিখ্যাত বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত এবং বিক্রমশীল মহাবিহারের আচার্য অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় এই সোমপুর মহাবিহারেও অতিবাহিত করেছিলেন এবং এখানেই তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শাস্ত্রের তিব্বতি অনুবাদ সম্পন্ন করেছিলেন।
পতন ও বর্তমান অবস্থা
একাদশ শতাব্দীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক আক্রমণ (যেমন— বঙ্গাল বাহিনীর আক্রমণ) এবং পরবর্তীতে পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর হিন্দু সেন রাজবংশের উত্থানের ফলে এই বিহারের গৌরব ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে এটি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয় এবং কালের বিবর্তনে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। মাটির স্তূপের নিচে চাপা পড়ে এটি একটি পাহাড়ের রূপ ধারণ করেছিল বলেই স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছিল ‘পাহাড়পুর’।
ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
পরবর্তীতে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের (বিশেষ করে কাশীনাথ নারায়ণ দীক্ষিতের নেতৃত্বে) ফলে এই সুবিশাল ধ্বংসাবশেষ পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের ক্ষেত্রে এর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) সোমপুর মহাবিহারকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।