পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা
প্রাচীন ভারতের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল নালন্দা মহাবিহার। বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনার কাছে রাজগিরের (প্রাচীন রাজগৃহ) সন্নিকটে এটি অবস্থিত। পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী শাসক সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত-এর শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন এবং বাংলার পাল রাজাদের (বিশেষ করে সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের) উদার পৃষ্ঠপোষকতায় নালন্দা একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম
নালন্দা ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং সুবৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর স্বর্ণযুগে এখানে প্রায় ১০,০০০ শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ আবাসিক শিক্ষক অবস্থান করতেন।
-
আন্তর্জাতিক কেন্দ্র: প্রাচীনকালে জ্ঞানার্জনের তীর্থস্থান হিসেবে চীন, জাপান, কোরিয়া, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য এবং মধ্য এশিয়া থেকে অগণিত শিক্ষার্থী এখানে আসতেন।
-
পাঠ্যবিষয়: মহাযান বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্র হলেও এখানে শিক্ষার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। বৌদ্ধ দর্শন ছাড়াও এখানে বেদ, উপনিষদ, ন্যায়শাস্ত্র (Logic), সংস্কৃত ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা (আয়ুর্বেদ), গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা শেখানো হতো।
-
কঠোর ভর্তি প্রক্রিয়া: এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রবেশদ্বারের রক্ষীরাও (যাঁদের ‘দ্বারপণ্ডিত’ বলা হতো) আগত শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রশ্ন করতেন, যার সঠিক উত্তর দিতে পারলেই কেবল ভেতরে প্রবেশের ও ভর্তির সুযোগ মিলত।
বিখ্যাত পণ্ডিত ও পরিব্রাজক
নালন্দার ইতিহাসে বহু বিখ্যাত পণ্ডিতের নাম জড়িয়ে আছে, যেমন— নাগার্জুন, ধর্মপাল এবং শীলভদ্র। সপ্তম শতাব্দীতে বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত শীলভদ্র নালন্দার মহাস্থবির বা আচার্য (উপাচার্য) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (Xuanzang) এবং ইৎসিং (Yijing) এখানে দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁদের রচিত ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেই আধুনিক ইতিহাসবিদরা নালন্দার শিক্ষা ব্যবস্থা ও গৌরবময় জীবনযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ জানতে পেরেছেন।
স্থাপত্য ও গ্রন্থাগার
নালন্দার স্থাপত্যশৈলী ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সম্পূর্ণ লাল ইটে নির্মিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শ্রেণিকক্ষ, ১০৮টি মঠ (শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল), সুদৃশ্য স্তূপ এবং ধ্যানকেন্দ্র ছিল। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ‘ধর্মগঞ্জ’ নামের সুবিশাল গ্রন্থাগার চত্বর। এই গ্রন্থাগারটি তিনটি সুউচ্চ ভবনে বিভক্ত ছিল— ‘রত্নসাগর’, ‘রত্নোদধি’ (যা নয় তলা বিশিষ্ট ছিল বলে জানা যায়) এবং ‘রত্নরঞ্জক’। এখানে লক্ষ লক্ষ দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল।
পতন ও ধ্বংস
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে (আনুমানিক ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে) তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি-র নির্মম আক্রমণের ফলে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, বখতিয়ার খলজি এর সুবিশাল গ্রন্থাগারে আগুন লাগিয়ে দেন। ধারণা করা হয়, সেই লক্ষ লক্ষ অমূল্য পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞের সময় এখানকার হাজার হাজার নিরীহ বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যার মাধ্যমে ভারতে বৌদ্ধ শিক্ষার এক সোনালি অধ্যায়ের চির অবসান ঘটে।
বর্তমান অবস্থা ও উপসংহার
জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের ক্ষেত্রে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচীন ভারতের এক অনন্য অহংকার। ১৯১৫ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে এই বিশাল ধ্বংসাবশেষ পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) নালন্দার ধ্বংসাবশেষকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রাচীন নালন্দার সেই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বর্তমানে কাছাকাছি স্থানে একটি আধুনিক ‘নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে নালন্দা আজও এক বিস্ময়কর নাম।