ধর্মপাল ছিলেন পাল রাজবংশের দ্বিতীয় এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি। তাঁর রাজত্বকাল (আনুমানিক ৭৮১–৮২১ খ্রিস্টাব্দ) ছিল বাংলার ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়, যখন পাল সাম্রাজ্য কেবল বাংলার ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে উত্তর ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। পিতা গোপালের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যকে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের রূপ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিল্প ও শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তিনি ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। (উৎস: ড. নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’)
সাম্রাজ্য বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাব
ধর্মপাল সিংহাসনে বসার পর পাল সাম্রাজ্যকে সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেন। তৎকালীন উত্তর ভারতের রাজনীতিতে কনৌজ ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। ধর্মপাল কনৌজের সিংহাসনে নিজের অনুগত ব্যক্তিকে বসিয়ে সমগ্র উত্তর ভারতের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি প্রয়াগ, বারানসী এবং গয়া পর্যন্ত তাঁর রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, ধর্মপাল ছিলেন একজন অত্যন্ত সুদক্ষ সমরনায়ক, যিনি একই সাথে যুদ্ধ এবং কূটনীতির মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। তাঁর এই বিশাল বিজয়ের কথা বিখ্যাত ‘খালিমপুর তাম্রশাসনে’ বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। (উৎস: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘History of Ancient Bengal’)
শিক্ষানুরাগী ও জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষক
ধর্মপাল কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জ্ঞান ও শিক্ষার এক মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর অমর কীর্তি হলো বিক্রমশীল মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করা। এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়, যা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ বা অনেক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতো। এখানে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ব্যাকরণ ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হতো। দেশ-বিদেশ থেকে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা এখানে শিক্ষার জন্য আসত। এছাড়াও, পাহাড়পুরের বিখ্যাত সোমপুর মহাবিহার বা সোমপুর বৌদ্ধ বিহারটিও ধর্মপালের আমলেই নির্মিত হয়েছিল, যা আজও তার স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। (উৎস: ড. এ.এম. চৌধুরী, ‘Dynastic History of Bengal’)
ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক অবস্থান
পাল শাসকরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও, ধর্মপাল ছিলেন সকল ধর্মের প্রতি অত্যন্ত সহনশীল। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও, তিনি ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিভিন্ন শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি ব্রাহ্মণদের ভূমি দান এবং বিভিন্ন বৈদিক অনুষ্ঠানের জন্য অর্থ সহায়তা প্রদান করতেন। এই ধর্মীয় সহনশীলতার ফলেই তাঁর আমলে সমাজে শান্তি ও স্থায়িত্ব বজায় ছিল, যা দীর্ঘকাল বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছিল। (উৎস: ড. এন. কে. ভট্টাচার্য, ‘প্রাচীন বাংলার ধর্ম ও সমাজ’)
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
ধর্মপাল ছিলেন একজন দূরদর্শী শাসক। তিনি কেবল রাজ্য জয়ের নেশায় মত্ত ছিলেন না, বরং একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। পাল রাজাদের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা তাঁর আমলেই পূর্ণতা লাভ করে। তিনি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছিলেন এবং প্রজাদের কল্যাণে নিয়মিত নজর রাখতেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দেবপাল পিতার রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন।
উপসংহারে বলা যায়, ধর্মপাল ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত নায়ক। তাঁর হাত ধরেই বাংলা প্রথমবারের মতো ভারতের রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালনের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার এবং বিক্রমশীল মহাবিহারের মতো অসামান্য স্থাপত্যকীর্তি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ধর্মপালের শাসনামলে বাংলা কতটা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ছিল। তিনি কেবল রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগের নির্মাতা, যার আদর্শ ও কাজ আজও বাঙালির গৌরবের ধারক। (উৎস: ড. নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’)