‘টেরাকোটা’ (Terracotta) বা পোড়ামাটির শিল্প হলো মাটি দিয়ে কোনো শিল্পকর্ম তৈরি করে তা আগুনে পুড়িয়ে স্থায়ী রূপ দেওয়ার এক সুপ্রাচীন মাধ্যম। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় পাথরের ব্যাপক অভাব থাকায় নদীর নরম এবং সহজলভ্য পলিমাটিই হয়ে উঠেছিল মন্দির ও বিহারের দেয়াল অলঙ্করণের প্রধান মাধ্যম (Gupta, 1971)। মাটি নিখুঁতভাবে ছাঁচে ফেলে বা হাতে খোদাই করে রোদে শুকানো হতো এবং পরে তা আগুনে পুড়িয়ে লালচে বা বাদামি রঙের মজবুত ফলকচিত্রে পরিণত করা হতো (Glassie, 1997)।
প্রাচীন বাংলার বিহার ও পোড়ামাটির কাজ
প্রাচীন বাংলার পাল ও চন্দ্র রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত বৌদ্ধ বিহারগুলোর দেয়াল অলঙ্করণে পোড়ামাটির ফলকের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।
-
পাহাড়পুর (সোমপুর মহাবিহার): নওগাঁর পাহাড়পুরে প্রাপ্ত সোমপুর মহাবিহারে প্রায় ২,৮০০টিরও বেশি পোড়ামাটির ফলকচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রাচীন বাংলার লোকায়ত শিল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন (Dikshit, 1938)। এখানে দেব-দেবীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সাপুড়ে, শিকারি, বিভিন্ন পশুপাখি এবং লতাপাতার জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে (Saraswati, 1962)।
-
ময়নামতী (শালবন বিহার): কুমিল্লার ময়নামতীতে প্রাপ্ত ফলকগুলোতে পাহাড়পুরের মতোই গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও লোকজ সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। এখানকার শিল্পীদের কাজে স্থানীয় রীতিনীতির প্রাধান্য বেশি দেখা যায় (Ahmed, 1975)।
-
মহাস্থানগড়: বগুড়ার মহাস্থানগড়ে (প্রাচীন পুণ্ড্রনগর) মৌর্য, শুঙ্গ এবং গুপ্ত যুগের চমৎকার ও সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত পোড়ামাটির মূর্তি ও ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে (Alam, 1993)।
মধ্যযুগের মন্দির স্থাপত্য ও টেরাকোটা
ষোড়শ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু মন্দির নির্মাণে পোড়ামাটির ফলকচিত্রের এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা হয়।
-
কান্তজীর মন্দির: বাংলাদেশের দিনাজপুরে অবস্থিত কান্তজীর মন্দির (১৭২২-১৭৫২) মধ্যযুগীয় পোড়ামাটির অলঙ্করণের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। এই মন্দিরের চারদিকের দেয়ালে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি, শ্রীকৃষ্ণের লীলা এবং তৎকালীন নবাব ও জমিদারদের শিকারের দৃশ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে (Michell, 1983)।
-
বিষ্ণুপুরের মন্দিরসমূহ: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত মন্দিরগুলোতে (যেমন— জোড়বাংলা ও শ্যামরায় মন্দির) পোড়ামাটির ফলকের অপরূপ কাজ রয়েছে, যেখানে মূলত বৈষ্ণব ধর্ম ও কৃষ্ণলীলার প্রাধান্য দেখা যায় (Ghosh, 2005)।
শিল্পের বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক তাৎপর্য
পোড়ামাটির ফলকচিত্রগুলো কেবল ধর্মীয় আখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উচ্চবিত্তের পাশাপাশি বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, কৃষক, তাঁতি ও জেলেদের জীবনযাপন এসব ফলকে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে এসেছে (Datta, 1959)। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব কল্পনা ও তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল এই পোড়ামাটির ফলকগুলোতে খোদাই করে গেছেন।