ময়নামতী প্রাচীন বাংলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, যা বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায় লালমাই পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত (Khan, 1963)। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে প্রাচীন সমতট (বর্তমান কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল) এলাকায় বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক অসামান্য বিকাশ ঘটেছিল, যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই ময়নামতী।
নামকরণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকদের মতে, একাদশ শতাব্দীর চন্দ্র রাজবংশের পরাক্রমশালী রাজা গোবিন্দচন্দ্রের মাতা ‘রানি ময়নামতী’-র নামানুসারে এই বিস্তীর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে (Ahmed, 1975)। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি মূলত খড়্গ, দেব এবং চন্দ্র রাজবংশের শাসকদের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহ
ময়নামতী এলাকায় প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি অত্যন্ত সুপরিচিত:
-
শালবন বিহার: ময়নামতীর সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা হলো শালবন বিহার। এটি পাহাড়পুর বা সোমপুর মহাবিহারের মতোই একটি সুবিশাল আবাসিক বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। এর কেন্দ্রে একটি বিশাল ক্রুশাকার মন্দির রয়েছে, যা চারদিক থেকে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ১১৫টি কক্ষ বা মঠ দ্বারা পরিবেষ্টিত। অষ্টম শতাব্দীতে দেব বংশের রাজা ভবদেব এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে এর প্রাচীন নাম ছিল ‘ভবদেব মহাবিহার’ (Imam, 2000)।
-
কুটিলা মুড়া: এটি শালবন বিহারের উত্তরে অবস্থিত। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের ‘ত্রিরত্ন’ অর্থাৎ বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘ-এর প্রতীক হিসেবে তিনটি সুউচ্চ ও বিশালাকার স্তূপ (Stupa) আবিষ্কৃত হয়েছে।
-
চারপত্র মুড়া ও ইটাখোলা মুড়া: চারপত্র মুড়ায় খনন করে চন্দ্র রাজবংশের রাজাদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ তাম্রশাসন বা রাজকীয় দলিল পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন সমতটের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্গঠনে অমূল্য। ইটাখোলা মুড়ায় আবাসিক বিহার এবং চমৎকার একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
পোড়ামাটির ফলক ও অন্যান্য নিদর্শন
ময়নামতীতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে অসংখ্য অমূল্য নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বর্তমানে ময়নামতী জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে:
-
পোড়ামাটির ফলক (Terracotta): পাহাড়পুরের মতোই শালবন বিহার ও অন্যান্য স্তূপের দেয়ালগুলো চমৎকার পোড়ামাটির ফলকচিত্র দিয়ে সজ্জিত ছিল। এসব ফলকে প্রাচীন বাংলার সাধারণ মানুষ, নর্তকী, যোদ্ধা এবং বিভিন্ন পশুপাখির অত্যন্ত জীবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে (Glassie, 1997)।
-
মুদ্রা ও ব্রোঞ্জ মূর্তি: এখান থেকে বিপুল সংখ্যক স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আব্বাসীয় খলিফাদের মুদ্রাও রয়েছে, যা প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সমতট অঞ্চলের সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক সম্পর্কের অকাট্য প্রমাণ দেয়। এছাড়া এখানে প্রচুর চমৎকার ব্রোঞ্জের মূর্তি, বিশেষ করে বুদ্ধ, তারা এবং বোধিসত্ত্বের মূর্তি পাওয়া গেছে, যা তৎকালীন ধাতুশিল্পের উৎকর্ষের প্রমাণ বহন করে (Khan, 1963)।
উপসংহার প্রাচীন বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম ও সভ্যতার বিস্তার অনুধাবনের ক্ষেত্রে ময়নামতী এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দলিল। এর বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষগুলো কেবল প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শনই নয়, বরং হাজার বছর আগের বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।