‘কিশোর ভারতী’ বাংলা ভাষায় প্রকাশিত শিশু ও কিশোরদের অন্যতম জনপ্রিয়, ঐতিহ্যবাহী এবং বহুল পঠিত একটি মাসিক পত্রিকা। ১৯৬৮ সালে প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই পত্রিকার গৌরবময় যাত্রা শুরু হয় (Chattopadhyay, 2010)। পরবর্তীতে এর প্রকাশনার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে কলকাতার স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা ‘পত্রভারতী’। দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর তাঁর পুত্র এবং বিশিষ্ট লেখক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সফলতার সাথে এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বিষয়বস্তু ও বৈচিত্র্য
‘কিশোর ভারতী’ শুরু থেকেই তার বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তুর জন্য কিশোর পাঠকদের মন জয় করেছিল। এই পত্রিকাটিতে কেবল গল্প, উপন্যাস বা কবিতাই নয়, বরং বিজ্ঞান, ইতিহাস, খেলাধুলা, ভ্রমণকাহিনি, ম্যাজিক এবং ধাঁধার মতো শিক্ষণীয় ও বিনোদনমূলক নানা বিভাগের দারুণ সমন্বয় ঘটানো হতো। এটি কিশোর মনন গঠনে এবং তাদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস তৈরিতে একটি সর্বাঙ্গীণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে (Bandyopadhyay, 2015)।
উল্লেখযোগ্য অবদানকারী ও কমিক্স
বাংলার প্রথিতযশা প্রায় সকল শিশুসাহিত্যিকই বিভিন্ন সময়ে ‘কিশোর ভারতী’-তে লিখেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এবং শৈলেন ঘোষের মতো দিকপাল লেখকদের রচনা এই পত্রিকার পাতায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
তবে, ‘কিশোর ভারতী’র জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান ও ঐতিহাসিক কারণ হলো প্রখ্যাত কমিক্স শিল্পী নারায়ণ দেবনাথের অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলো। তাঁর কালজয়ী কমিক্স সিরিজ ‘নন্টে ফন্টে’ ১৯৬৯ সাল থেকে এই পত্রিকাতেই প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে এবং তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে (Debnath, 2013)। এছাড়া ‘বাঁটুল দি গ্রেট’ এবং ‘হাঁদা ভোঁদা’-এর মতো চরিত্রগুলোও শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই পত্রিকার বড় ভূমিকা ছিল।
সাংস্কৃতিক প্রভাব ও পূজাবার্ষিকী
‘আনন্দমেলা’ এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাশাপাশি ‘কিশোর ভারতী’ বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের এক সুবর্ণ যুগকে প্রতিনিধিত্ব করে। পত্রিকাটির একটি অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এর বিশাল আকারের ‘শারদীয় সংখ্যা’ বা ‘পূজাবার্ষিকী’। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রকাশিত এই বিশেষ সংখ্যার জন্য বাঙালি কিশোর-কিশোরীরা সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। বাংলা কিশোর সাহিত্যের বিকাশ, কমিক্সের জনপ্রিয়করণ এবং নতুন প্রজন্মের লেখক তৈরিতে ‘কিশোর ভারতী’-র অবদান ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য (Chaudhuri, 2018)।