ড. দীনেশচন্দ্র সেন

ড. দীনেশচন্দ্র সেন (জন্ম: ৩ নভেম্বর, ১৮৬৬ – মৃত্যু: ২০ নভেম্বর, ১৯৩৯) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম পথিকৃৎ, বিশিষ্ট গবেষক, লোকসাহিত্য সংগ্রাহক এবং শিক্ষাবিদ। বাংলা ভাষার ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

দীনেশচন্দ্র সেন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন একজন শিক্ষক। দীনেশচন্দ্র ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ. পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, এবং সেখানেই তাঁর সাহিত্য গবেষণার বীজ রোপিত হয়।

‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ এবং স্বীকৃতি

কুমিল্লায় শিক্ষকতাকালে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুঁথি সংগ্রহ শুরু করেন। তাঁর এই নিরলস পরিশ্রমের ফসল হলো ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬)।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এটিই ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিজ্ঞানসম্মত, পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক ইতিহাস গ্রন্থ।

  • রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা: গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন যে, দীনেশচন্দ্রই প্রথম বাংলা সাহিত্যের বিশাল অরণ্যে পথ তৈরি করেছেন। এই বইটির মাধ্যমেই তিনি সেকালের বিদ্বান সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

লোকসাহিত্য সংরক্ষণ: ময়মনসিংহ গীতিকা

দীনেশচন্দ্র সেনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য রত্নভাণ্ডার সংগ্রহ ও সম্পাদনা।

  • গীতিকা সংগ্রহ: চন্দ্রকুমার দে-র মতো লোকসাহিত্য সংগ্রাহকদের সাহায্যে তিনি পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অলিখিত লোকগাথা ও পালাগান সংগ্রহ করেন।

  • বিশ্বদরবারে উপস্থাপন: তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ (১৯২৩) এবং ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ (১৯২৬)। মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী বা রূপবতীর মতো বাংলার গ্রামীণ নারীদের প্রেম, বিরহ ও সাহসিকতার গল্পগুলো এই গীতিকাগুলোর মাধ্যমে শুধু বাংলায় নয়, বরং ইংরেজি অনুবাদের (Eastern Bengal Ballads) কল্যাণে বিশ্বদরবারে পৌঁছে যায়। রোমাঁ রোলাঁ ও সিলভ্যাঁ লেভির মতো বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিতেরা এই গীতিকাগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

কর্মজীবন ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দীনেশচন্দ্রের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলো’ হিসেবে নিয়োগ দেন। দীর্ঘকাল তিনি এই পদে থেকে বাংলা ভাষার গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

  • ‘বৃহৎ বঙ্গ’ (১৯৩৫): এটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহৎ দলিল।

  • ‘রামায়ণী কথা’ (১৯০৪): রামায়ণের কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচিত একটি অপূর্ব গ্রন্থ, যার ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

  • এছাড়া সতী, ফুল্লরা, বেহুলা প্রভৃতি পৌরাণিক ও মঙ্গলকাব্যের নারী চরিত্র নিয়ে তিনি বহু সুখপাঠ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।

স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডি.লিট’ (Doctor of Literature) ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

উপসংহারে বলা যায়, ড. দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলার শেকড়সন্ধানী এক সাধক। তিনি যখন কাজ শুরু করেছিলেন, তখন বাংলা সাহিত্যের কোনো গোছানো ইতিহাস বা উপাদান সুলভ ছিল না। তিনি নিজ পরিশ্রমে বাংলার ধুলোমাটি থেকে পুঁথি ও গাথা উদ্ধার করে বাংলা সাহিত্যকে এক মজবুত ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রদান করেছিলেন। তাঁর কাজের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বা ড. সুকুমার সেনের মতো গবেষকেরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ রূপ দিয়েছেন।