অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্ম: ৭ আগস্ট, ১৮৭১ – মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর, ১৯৫১) ছিলেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ, স্বনামধন্য ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ (Bengal School of Art)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় জাদুকর। তিনি ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র। ভারতের নিজস্ব শিল্পকলা ও ঐতিহ্যকে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত করে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)
শিল্পকলার নবরূপায়ণ ও স্বদেশী চেতনা
অবনীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রকলার প্রথম পাঠ গ্রহণ করেছিলেন ইউরোপীয় শিল্পীদের (যেমন: ও. গিলার্ডি এবং চার্লস পামার) কাছে। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি পাশ্চাত্য রীতির বস্তুতান্ত্রিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব একটি আধ্যাত্মিক এবং আবেগপূর্ণ ভাষা রয়েছে।
-
বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট: ব্রিটিশদের প্রবর্তিত পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতির বদলে তিনি মুঘল, রাজপুত এবং অজন্তা গুহাচিত্রের শৈলীর প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯০৭ সালে তিনি তাঁর দাদা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে মিলে ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় এক নবজাগরণের জন্ম দেয়।
-
জাপানি ‘ওয়াশ’ পদ্ধতি: বিখ্যাত জাপানি শিল্পী ওকাকুরা কাকুজো এবং য়োকোয়ামা তাইকানের সংস্পর্শে এসে তিনি জাপানি ‘ওয়াশ’ (Wash) বা জলরঙের ধৌত পদ্ধতির সাথে ভারতীয় রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটান। (উৎস: বাংলাপিডিয়া)
বিখ্যাত চিত্রকর্ম ও ‘ভারতমাতা’
তাঁর আঁকা ছবিগুলোতে রঙের স্নিগ্ধতা এবং রহস্যময় এক পরিবেশের সৃষ্টি হতো। তাঁর অসংখ্য কালজয়ী ছবির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘ভারতমাতা’ (১৯০৫)।
-
ভারতমাতার তাৎপর্য: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় তিনি এই ছবিটি আঁকেন। চার হাত বিশিষ্ট, গৈরিক বসন পরিহিতা এবং অন্ন-বস্ত্র-পুস্তক-জপমালা ধারিণী এই দেবীমূর্তিটি রাতারাতি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এবং স্বদেশী চেতনার এক অসামান্য প্রতীকে পরিণত হয়। ভগিনী নিবেদিতা এই ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
-
অন্যান্য বিখ্যাত ছবি: তাঁর অন্যান্য অমর চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে শাহজাহানের মৃত্যু (The Passing of Shah Jahan), গণেশ জননী, কচ ও দেবযানী, এবং অশোকের রানী। (উৎস: বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী)
শিশুসাহিত্য ও ‘অবন ঠাকুর’
চিত্রশিল্পের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে শিশু-কিশোর সাহিত্যে তিনি ‘অবন ঠাকুর’ নামে এক নিজস্ব জাদুকরী জগৎ তৈরি করেছিলেন। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি ছিল ছবির মতোই স্পষ্ট এবং রূপকথার মতো মায়াবী। তুলি দিয়ে তিনি যেমন ছবি আঁকতেন, কলম দিয়েও তিনি ঠিক একইভাবে শব্দের ছবি আঁকতেন।
-
কালজয়ী শিশুসাহিত্য: তাঁর লেখা বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘রাজকাহিনী’, ‘নালক’, এবং ‘শকুন্তলা’। ‘রাজকাহিনী’তে তিনি রাজপুতদের বীরত্বের ইতিহাসকে এমন রোমাঞ্চকর ভাষায় তুলে ধরেছেন যা আজও বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। (উৎস: বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাস)
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন শিল্পী বা লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতীয় আত্মপরিচয়ের এক মহান রূপকার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা যখন প্রমাণ করতে চাইত যে ভারতের নিজস্ব কোনো উন্নত শিল্পকলা বা নান্দনিকতা নেই, তখন অবনীন্দ্রনাথ তাঁর তুলির আঁচড়ে ভারতের গৌরবময় অতীতকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর তৈরি করা পথ ধরেই পরবর্তীতে নন্দলাল বসু, অসিত কুমার হালদার এবং মুকুল দে-র মতো বিশ্বমানের শিল্পীরা উঠে এসেছিলেন। ১৯৫১ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহারে বলা যায়, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এই নীরব সাধক আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলাকে স্বনির্ভর এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত শিল্পরীতি আজ ভারতের শিল্পকলা শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)