সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬–১৯৪৭) বাংলা সাহিত্যের ‘কিশোর কবি’ বা ‘মার্কসবাদী কবি’ হিসেবে চিরস্মরণীয়। মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন পেলেও তাঁর অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা, বিদ্রোহী চেতনা এবং সাম্যবাদী দর্শন বাংলা সাহিত্যে এক অমোঘ ছাপ রেখে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলায়। কৈশোর থেকেই তিনি রাজনীতি এবং লেখালেখির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং ছাত্র আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পার্টির মুখপত্র ‘দৈনিক স্বাধীনতা’র ‘কিশোর সভা’ বিভাগটি তিনি সম্পাদনা করতেন।
সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও চেতনা
সুকান্তের কবিতায় রোমান্টিক কল্পনার চেয়ে রূঢ় বাস্তবতার প্রকাশ ছিল অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
-
সাম্যবাদী দর্শন: শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর সমমর্মিতা। তাঁর কবিতায় পুঁজিপতি ও শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।
-
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চিত্র: ১৯৪৩ সালের তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ভয়াবহতা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণা তাঁর কবিতায় এক নতুন রূপকল্প তৈরি করেছিল।
-
বিদ্রোহ ও তারুণ্যের শক্তি: তিনি তরুণ সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং একটি নতুন, সুন্দর ও বৈষম্যহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন।
অমর পঙ্ক্তি ও কালজয়ী কবিতা
সুকান্তের বেশ কিছু কবিতা ও পঙ্ক্তি বাঙালির চেতনায় প্রবাদের মতো গেঁথে আছে। তাঁর ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় রোমান্টিকতার খোলস ভেঙে তিনি বাস্তবতার যে চরম সত্য তুলে ধরেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী আঘাত ছিল:
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়: পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
তাঁর আরেকটি অমর কবিতা ‘ছাড়পত্র’। এই কবিতায় নবজাতকের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার যে দৃঢ় অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে:
“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; …এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি— নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এছাড়া ‘রানার’, ‘দেশলাইয়ের কাঠি’, ‘সিঁড়ি’, ‘চিল’ ও ‘আঠারো বছর বয়স’ তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালজয়ী কবিতা।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
জীবদ্দশায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পর তাঁর বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্যোগে গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:
-
ছাড়পত্র (১৯৪৭)
-
ঘুম নেই (১৯৫০)
-
পূর্বাভাস (১৯৫০)
-
মিঠেকড়া (১৯৫১)
-
অভিযান (১৯৫৩)
অকাল মৃত্যু ও মূল্যায়ন
দারিদ্র্য, অনাহার এবং পার্টির কাজে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে সুকান্ত ভট্টাচার্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে (ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন মাস আগে) এই অসাধারণ প্রতিভাধর কবির মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
বয়সে কিশোর হলেও চিন্তায় ও দর্শনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিণত। তাঁর কলম ছিল শোষিতের হাতিয়ার এবং নিপীড়িতের কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্র-নজরুল যুগের অবসানের পর বাংলা কবিতায় যে নতুন রূঢ় বাস্তববাদী ও গণমুখী ধারার সূচনা হয়েছিল, সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন সেই ধারার এক প্রদীপ্ত ধ্রুবতারা। মাত্র কয়েক বছরের সাহিত্য সাধনায় তিনি যে অমর সৃষ্টি রেখে গেছেন, তা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময়।