শামসুর রাহমান (১৯২৯–২০০৬) বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যাঙ্গনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী কবি। তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ‘নাগরিক কবি’ বা বাংলাদেশের ‘প্রধান কবি’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, নগরজীবনের বাস্তবতা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার যে জোয়ার এসেছিল, শামসুর রাহমান ছিলেন তার অন্যতম প্রধান রূপকার।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরনো ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং জীবনযাপন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করার সময় থেকেই তাঁর কবিতা লেখার শুরু এবং আধুনিক সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।
সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও অবদান
শামসুর রাহমানের কবিতায় মূলত দুটি ধারা প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়: ১. নগরজীবনের চিত্র: তাঁর শুরুর দিকের কবিতায় নাগরিক জীবনের একাকিত্ব, বিষাদ, প্রেম, হতাশা এবং মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। ২. স্বদেশপ্রেম ও দ্রোহ: ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল সর্বদা সোচ্চার। তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছিলেন।
কালজয়ী কবিতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলো বাঙালির জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর লেখা কিছু অমর কবিতা হলো:
-
“স্বাধীনতা তুমি” * “তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা”
-
“আসাদের শার্ট” (উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত)
-
“বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” (ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত)
-
“পন্ডশ্রম”
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ষাটের অধিক। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
-
প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০)
-
রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩)
-
বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭)
-
নিজ বাসভূমে (১৯৭০)
-
বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২ – মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত)
-
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪)
পেশাগত জীবন ও স্বীকৃতি
পেশাগত জীবনে শামসুর রাহমান ছিলেন একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক। তিনি দীর্ঘকাল ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের প্রায় সব বড় পুরস্কার লাভ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২)
-
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯)
-
একুশে পদক (১৯৭৭)
-
স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯১)
শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির যেকোনো গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক অবিচল বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠস্বর।