অপভ্রংশ

‘অপভ্রংশ’ (Apabhramsha) হলো ভারতীয় আর্যভাষার (Indo-Aryan Languages) বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যুগান্তকারী এবং সন্ধিক্ষণমূলক স্তর। ভাষাবিজ্ঞানের কালানুক্রমিক বিভাজন অনুযায়ী, প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা (যথা: বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত) কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষায় (পালি ও বিভিন্ন প্রাকৃত) রূপান্তরিত হয়। এই মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার একেবারে সর্বশেষ বা অন্তিম স্তরটিকেই ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘অপভ্রংশ’ বলা হয়। এটি এমন একটি ক্রান্তিকালীন ভাষা-স্তর, যা একদিকে ধ্রুপদী প্রাকৃত ভাষাগুলোর ঐতিহ্য বহন করেছে, অন্যদিকে আধুনিক বা নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলোর (যেমন: বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, অসমীয়া, ওড়িয়া ইত্যাদি) জন্ম দিয়েছে। বস্তুত, প্রাচীন ও নব্য ভারতীয় ভাষা-পরিবারের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সেতুবন্ধন রচনা করেছে এই অপভ্রংশ ভাষা। এর কালসীমা সাধারণত খ্রিস্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত বলে পন্ডিতেরা অনুমান করেন, তবে এর সাহিত্যের স্বর্ণযুগ ছিল খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়।

নামকরণের ব্যুৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ধারণা (Etymology and Historical Concept)

‘অপভ্রংশ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘অপ’ (হীন, বিকৃত বা স্খলিত) উপসর্গের সাথে ‘ভ্রংশ’ (চ্যুতি বা পতন) শব্দ যুক্ত হয়ে এর সৃষ্টি। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘স্খলিত ভাষা’, ‘বিকৃত শব্দ’ বা ‘যে ভাষা তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে’। সংস্কৃত বৈয়াকরণদের আদি যুগে এই শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ভাষাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো না, বরং সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ-বহির্ভূত বা অশিষ্ট প্রয়োগকে বোঝাতেই এই শব্দের অবতারণা করা হয়েছিল।

অপভ্রংশ শব্দের সর্বপ্রথম প্রামাণ্য উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রচিত পতঞ্জলির বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘মহাভাষ্য’-এ। পতঞ্জলি সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত কিন্তু শিষ্টসমাজে অচল বা ব্যাকরণের নিয়ম-বহির্ভূত শব্দাবলিকে (অপশব্দ) বোঝাতে অপভ্রংশ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘গৌঃ’ (গরু) হলো একটি শুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখে উচ্চারিত ‘গাভী’, ‘গোণী’, ‘গোতা’, ‘গোপোতলিকা’ ইত্যাদি শব্দগুলো হলো অপভ্রংশ বা বিকৃত শব্দ। পতঞ্জলির এই সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করেই প্রাচীনকালে পালি ও প্রাকৃত ভাষার লোকজ শব্দগুলোকে অপভ্রংশ বলা হতো।

পরবর্তীকালে, বিশেষ করে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর পর থেকে, আলংকারিক ও বৈয়াকরণদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পুরুষোত্তম, দণ্ডী, ভামহ প্রমুখ প্রাকৃত বৈয়াকরণ ও আলংকারিকরা অপভ্রংশকে কেবল ‘বিকৃত শব্দ’ না বলে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বতন্ত্র সাহিত্যিক ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন। তাঁরা অপভ্রংশকে প্রাকৃত ভাষার একটি শেষ স্তর হিসেবে সরাসরি স্বীকার না করে, এটিকে একটি পৃথক ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে, উত্তরাপথ (উত্তর ভারত) ও দক্ষিণাপথের উত্তরভাগে সংস্কৃত ভাষার সমান্তরালে বা সহযোগীরূপে প্রচলিত সাহিত্যিক ‘নাগরক’ বা ‘নাগর অপভ্রংশ’-ই হলো এই ভাষার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। আলংকারিক ভামহ (৭ম শতক) এবং দণ্ডী (৮ম শতক) ভাষাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন: সংস্কৃত, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে, অপভ্রংশে রচিত কাব্যের সাহিত্যিক মান বা রসোত্তীর্ণতা সংস্কৃত বা প্রাকৃত কাব্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। কালক্রমে দ্বাদশ শতকে পুরুষোত্তম এই ভাষাকে শিষ্ট ও শিক্ষিত সমাজের ভাষা বলেও অভিহিত করেন।

ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য (Linguistic and Grammatical Characteristics)

একটি ভাষা-স্তর হিসেবে অপভ্রংশের ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এখানেই প্রাচীন ভাষার সংশ্লেষণী (Synthetic) রূপ ভেঙে গিয়ে নব্য ভাষার বিশ্লেষণী (Analytic) রূপের উন্মেষ ঘটতে শুরু করে। এর প্রধান ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Phonology): * প্রাকৃত ভাষার তুলনায় অপভ্রংশে স্বরধ্বনির পরিবর্তন আরও প্রকট হয়। বিশেষ করে শব্দের শেষের স্বরধ্বনি হ্রস্ব হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় (যেমন: দীর্ঘ ‘আ’ হয়ে যায় হ্রস্ব ‘অ’, ‘ঈ’ হয়ে যায় ‘ই’)।

  • যুক্তব্যঞ্জনের সরলীকরণ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে আধুনিক ভাষাগুলোতে (যেমন বাংলায়) ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবনের (Compensatory Lengthening) জন্ম দেয়।

  • এই স্তরে নাসিক্যীভবন (Nasalization) অত্যন্ত প্রবল আকার ধারণ করে। শব্দের মধ্যে বা শেষে ‘ম’ বা ‘ন’ থাকলে তা অনেক সময় লোপ পেয়ে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনিকে সানুনাসিক বা চন্দ্রবিন্দুযুক্ত করে তোলে।

২. রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Morphology): * সংস্কৃত এবং প্রাকৃত ভাষার মতো অপভ্রংশ আর কারক-বিভক্তি প্রধান (Inflectional) ভাষা থাকেনি। সংস্কৃতের জটিল আটটি কারক ও তিন বচনের রূপ ভেঙে গিয়ে অত্যন্ত সরল হয়ে যায়।

  • বিভক্তির ক্ষয়ের কারণে বাক্যে শব্দের অর্থ ও সম্পর্ক বোঝানোর জন্য অনুসর্গের (Postpositions) ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা আধুনিক বাংলা বা হিন্দি ভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

  • ক্রিয়ার কাল ও ভাব (Tense and Mood) বোঝাতে প্রাচীন ধাতুরূপের বদলে কৃদত্ত পদের (Participles) ব্যবহার জনপ্রিয় হয়।

৩. শব্দভাণ্ডার (Vocabulary): * অপভ্রংশের শব্দভাণ্ডার মূলত তদ্ভব (সংস্কৃত থেকে বিবর্তিত) শব্দ দ্বারা গঠিত। তবে এই স্তরে এসে প্রচুর পরিমাণে দেশি শব্দ (অনার্য বা স্থানীয় দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক ভাষা থেকে আগত শব্দ) সাহিত্যে প্রবেশ করতে শুরু করে, যা ভাষার প্রকাশক্ষমতাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

অপভ্রংশের আঞ্চলিক শ্রেণিবিভাগ এবং নব্য ভারতীয় আর্যভাষার উদ্ভব (Regional Classification and Birth of Modern Indo-Aryan Languages)

বর্তমান আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের সর্বজনস্বীকৃত মতবাদ হলো, প্রাচীন ভারতের সকল প্রাকৃত ভাষারই একটি করে অন্তিম বা শেষ স্তর ছিল, যাকে অপভ্রংশ বলা হয়। এই বিভিন্ন আঞ্চলিক অপভ্রংশ থেকেই বর্তমান ভারতের বিভিন্ন আধুনিক ভাষার জন্ম হয়েছে। প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের গবেষণা অনুযায়ী অপভ্রংশের প্রধান আঞ্চলিক রূপ এবং তা থেকে উদ্ভূত আধুনিক ভাষাগুলোর একটি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

  1. মাগধী অপভ্রংশ (Magadhi Apabhramsha): পূর্ব ভারতের মাগধী প্রাকৃত থেকে এই অপভ্রংশের উদ্ভব। এই অপভ্রংশ কালক্রমে ‘অবহট্ঠ’ (Abahattha) বা অপভ্রষ্ট নামক একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্তরের মধ্য দিয়ে গিয়ে দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়। পশ্চিমা শাখা থেকে ভোজপুরী, মগহী ও মৈথিলী—এই তিনটি বিহারি ভাষার জন্ম হয়। আর পূর্বী শাখা থেকে জন্মলাভ করে তিনটি গৌড়ীয় ভাষা: বাংলা, অসমীয়া এবং ওড়িয়া।
  2. শৌরসেনী অপভ্রংশ (Shauraseni Apabhramsha): মধ্যদেশ বা মথুরা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে প্রচলিত শৌরসেনী প্রাকৃত থেকে এর জন্ম। এটি অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি ভাষা ছিল। এই অপভ্রংশ থেকেই আধুনিক পশ্চিমা হিন্দি (যেমন: ব্রজভাষা, খড়ি বোলি, বুন্দেলি), গুজরাটি এবং রাজস্থানি ভাষার উদ্ভব ঘটেছে।
  3. অর্ধমাগধী অপভ্রংশ (Ardhamagadhi Apabhramsha): শৌরসেনী এবং মাগধী অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে (মূলত প্রাচীন কোশল বা আধুনিক উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল) এটি প্রচলিত ছিল। এখান থেকে পূর্বী হিন্দি (যেমন: অবধি, বাঘেলি, ছত্তিশগঢ়ি) ভাষার জন্ম হয়েছে। ৪. মহারাষ্ট্রী অপভ্রংশ (Maharashtri Apabhramsha): দক্ষিণাপথে প্রচলিত মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত থেকে এর উদ্ভব, যা থেকে আধুনিক মারাঠি এবং কোঙ্কনি ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। ৫. অন্যান্য অপভ্রংশ: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ‘পৈশাচী অপভ্রংশ’ থেকে লহন্দা ও পাঞ্জাবি ভাষার কিছু রূপ, সিন্ধু অঞ্চলের ‘ব্রাচড় অপভ্রংশ’ থেকে সিন্ধি ভাষা, এবং হিমালয় সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলের ‘খস অপভ্রংশ’ থেকে নেপালি, গাড়োয়ালি এবং কুমায়ুনি ভাষার জন্ম হয়েছে।

প্রাথমিক সাহিত্যিক নিদর্শন (Early Literary Evidences)

অপভ্রংশ ভাষা যে শুধু সাধারণ নিম্নশ্রেণির মানুষের কথ্য ভাষা ছিল তা নয়, কালক্রমে এটি রাজদরবার ও পন্ডিতসমাজে সাহিত্য রচনার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। অপভ্রংশের সাহিত্যিক প্রয়োগের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় ভরতমুনি বিরচিত ‘নাট্যশাস্ত্র’-এ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ৩য় শতকের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত)। এই প্রাচীন গ্রন্থে নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের মুখে অপভ্রংশে রচিত বেশ কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সে যুগেও সাহিত্যে এর প্রবেশ ঘটেছিল।

এছাড়া শ্বেতাম্বর জৈন সম্প্রদায়ের পবিত্র আগমগ্রন্থসমূহ (যেমন: আচা ২, ৪, ৫), পরবর্তীকালীন মহাযান বৌদ্ধগ্রন্থ (যেমন: লঙ্কাবতার সূত্র, ললিতবিস্তর, মহাবস্তু ইত্যাদি) এবং বিমলসূরির (৩য় শতক) মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে লিখিত ‘পউমচরিয়ম্’ নামক গ্রন্থে অপভ্রংশ ভাষার কিছু কিছু প্রয়োগ ও নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি কালিদাসের (৪র্থ শতক) অমর সৃষ্টি ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে রাজা পুরূরবার বিরহ বেদনায় গাওয়া গানগুলো অপভ্রংশে রচিত। এ থেকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয় যে, কালিদাসের সময়ে কিংবা তারও বহু পূর্ব থেকেই একটি সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে অপভ্রংশ ভাষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটেছিল এবং তা শিক্ষিত সমাজের রসবোধকে তৃপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।

জৈন সাহিত্য: অপভ্রংশের স্বর্ণযুগ (The Golden Age of Apabhramsha: Jain Literature)

অপভ্রংশ ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছেন জৈন মুনি এবং কবিগণ। অষ্টম শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত পশ্চিম ও মধ্য ভারতে জৈন পণ্ডিতরা অপভ্রংশ ভাষায় যে বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন, তা মধ্যযুগীয় ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়। তাঁরা কেবল ধর্মীয় গ্রন্থই রচনা করেননি; বরং বিভিন্ন চরিতকাব্য (Epic poetry), নীতিকাব্য (Didactic poetry), কথানক কাব্য (Narrative poetry), এবং গভীর জৈন দর্শন পর্যন্ত এই ভাষায় নিপুণভাবে রচনা করেছেন।

  • চরিতকাব্য বা মহাকাব্য (Charita Kavya / Epics): জৈন চরিতকাব্যগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্বয়ম্ভূদেবের (৭ম/৮ম শতক) ‘পউমচরিউ’ (পদ্মচরিত)-কে। স্বয়ম্ভূদেবকে ‘অপভ্রংশের বাল্মীকি’ বলা হয়। তাঁর এই গ্রন্থে ৫৬টি সন্ধি এবং ১২,০০০ শ্লোকে হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের কাহিনিকে জৈন আদর্শের ছাঁচে ফেলে রামচন্দ্রের (যাঁকে জৈনরা ‘পদ্ম’ বলতেন) জীবনকথা অত্যন্ত সুমধুর ছন্দে বর্ণিত হয়েছে। অপভ্রংশের আরেকজন শ্রেষ্ঠ মহাকবি হলেন পুষ্পদন্ত (১০ম শতক), যাঁকে ‘অপভ্রংশের ব্যাসদেব’ বলা হয়। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘মহাপুরাণ’। এটি একটি সুবিশাল মহাকাব্য যেখানে জৈনদের তেষট্টি জন শলাকাপুরুষ বা মহাপুরুষের পুণ্যময় জীবনকথা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর রচিত অন্য দুটি উল্লেখযোগ্য চরিতকাব্য হলো ‘জসহরচরিউ’ (যশোধরচরিত) এবং ‘নয়কুমারচরিউ’ (নাগকুমারচরিত)। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চরিতকাব্যের মধ্যে রয়েছে ধাহিলের (বা দাহিলের) ‘পউমসিরিচরিউ’ (১০ম শতক), হরিভদ্রের ‘নেমিণাহচরিউ’ (১১৫৯ খ্রি), এবং পদ্মকীর্তির ‘পার্শ্বপুরাণ’ (১৪শ শতক)। মহাভারতের কৃষ্ণ-বলরাম এবং কুরু-পাণ্ডবের কাহিনি অবলম্বনে রচিত আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ধবলকবির ‘হরিবংশপুরাণ’।
  • রোমান্টিক ও কথানক কাব্য (Akhyayika and Narrative Poetry): জৈন কবিরা ধর্মীয় আবরণের বাইরে গিয়ে অসাধারণ কিছু রোমান্টিক এবং আখ্যায়িকামূলক কাব্যও রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে ধনপালের (১০ম শতক) ‘ভবিস্সয়ত্তকহা’ (ভবিষ্যদত্ত কথা) একটি উৎকৃষ্ট রোমান্টিক কাব্য। বণিকপুত্র ভবিষ্যদত্তের দেশ-বিদেশ ভ্রমণ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রেম-বিরহের যে রোমাঞ্চকর বর্ণনা এই কাব্যে রয়েছে, তা মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলোর (যেমন: চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলের বণিক খণ্ড) পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ধার্মিকনায়ক সুদর্শনের কাহিনি অবলম্বনে নয়নন্দী (১০৪৪ খ্রি) ‘সুদর্শনচরিত’ রচনা করে বিশেষ যশস্বী হন। সিংহসেন ‘মেহেসরচরিউ’ (১৪৩৯ খ্রি) লিখে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি ‘রৈধূ’ ছদ্মনামে বেশি পরিচিত ছিলেন এবং এই নামেই তিনি ‘দহলক্থণ-জয়মাল’ ও ‘জীবন্ধরচরিত’ রচনা করেন। এই ‘জীবন্ধরচরিত’-কে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে আরও অনেক অপভ্রংশ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কনকামর মুনি (১৬৬৫ খ্রি) কর্তৃক বিরচিত ‘করকণ্ডচরিউ’ কাব্যে জৈন সাধু করকণ্ডের জীবনচরিত বিবৃত হয়েছে, যিনি জৈন ও বৌদ্ধ উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই অত্যন্ত পূজনীয় ছিলেন। কথানক বা গল্পমূলক কাব্যের মধ্যে শ্রীচন্দ্রের (১০ম বা ১২শ শতক) ‘কথাকোষ’ একটি উৎকৃষ্ট সংকলন গ্রন্থ। এতে ৫৩টি নীতিকথামূলক গল্প স্থান পেয়েছে, যেগুলোর ঘটনার পারিপাট্য এবং বর্ণনাশৈলী অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক।
  • নীতিকাব্য ও দর্শন (Didactic and Philosophical Works): নীতিমূলক কাব্য রচনায়ও জৈন পণ্ডিতগণ অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। প্রখ্যাত বৈয়াকরণ হেমচন্দ্রের সমসাময়িক ও জিনবল্লভ সূরির শিষ্য জিনদত্তসূরি (১০৭৫-১১৫৪ খ্রি) তিনখানি অমূল্য নীতিকাব্য লিখে যশস্বী হয়েছেন। তাঁর আচার্য জিনবল্লভ সূরির স্তুতিমূলক ‘চ্চচরী’ (চাচরী) একটি অত্যন্ত সুমধুর ক্ষুদ্র গীতিকাব্য। বহু উপদেশ, আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও দর্শনে পূর্ণ তাঁর আরও দুটি উল্লেখযোগ্য নীতিকাব্য হচ্ছে ‘উপদেশরসায়নরাস’ ও ‘কালস্বরূপকুলক’। সুপ্রভাচার্যের ‘বৈরাগ্যসার’ও (১৭৭১ খ্রি) অপভ্রংশ সাহিত্যের শেষভাগের একটি উল্লেখযোগ্য নীতিকাব্য।

দার্শনিক গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রভূত পাণ্ডিত্য ও গভীরতার পরিচয় দিয়েছেন প্রখ্যাত জৈনাচার্য জোইন্দু (যোগীনদ)। তাঁর কালনির্ধারণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কারও মতে তিনি খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে জীবিত ছিলেন, আবার কারও কারও মতে তাঁর আবির্ভাবকাল ১০০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে নয়। তাঁর রচিত ‘পরমাত্মপ্রকাশ’, ‘যোগসার’, ‘শ্রাবকাচারদোহক’ ও ‘দোহাপাহুড়’ অপভ্রংশ ভাষার অত্যন্ত গুরুগম্ভীর এবং উল্লেখযোগ্য দার্শনিক গ্রন্থ। জনশ্রুতি আছে যে, তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা ও দর্শনের ওপর প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। দর্শনবিষয়ক আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অপভ্রংশ গ্রন্থ হলো: দেবসেনের ‘সাবয়ধম্মদোহা’ (৮৯৪ খ্রি), রাজসিংহের ‘পাহুড়দোহা’ (১০ম শতক), অভয়দেব সূরির ‘জয়তিহুয়ণস্তোত্র’ প্রভৃতি।

পূর্বী অপভ্রংশ ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের অবদান (Eastern Apabhramsha and Buddhist Siddhas)

জৈনদের উল্লেখিত গ্রন্থগুলো মূলত পশ্চিমী (শৌরসেনী প্রভাবযুক্ত) ও দক্ষিণী অপভ্রংশে রচিত হয়েছিল। অন্যদিকে, ভারতের পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বাংলা, বিহার ও আসাম সংলগ্ন এলাকায় পূর্বী অপভ্রংশ বা মাগধী অপভ্রংশে যাঁরা সাহিত্য চর্চা করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন প্রধানত বাঙালি বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের সাধক বা সিদ্ধাচার্য। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এর সমসাময়িক বা ঠিক পূর্ববর্তী সময়ে এই সিদ্ধাচার্যগণ তাঁদের সাধনতত্ত্ব ও দর্শন প্রচারের জন্য অপভ্রংশ ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

তাঁদের মধ্যে কাহ্নপা (৭ম শতক), সরহপা (১০ম শতক), তিল্লোপা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাহ্নপা ও সরহপার রচিত ‘দোহাকোষ’ সাধনসংকেতমূলক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এই দোহাগুলো মূলত গুহ্য সাধনতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক উপদেশাত্মক হলেও, এতে প্রভূত কবিত্বশক্তির এবং উপমা-রূপকের চমৎকার নিদর্শন রয়েছে। ‘ডাকার্ণবতন্ত্র’ নামক গ্রন্থটিও এই একই শ্রেণির পূর্বী অপভ্রংশে রচিত।

ভাষাতাত্ত্বিক ও ছন্দতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পূর্বী অপভ্রংশের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরাই প্রথম কবিতায় অন্ত্যমিল বা ‘অন্ত্যানুপ্রাস’-এর (End-rhyme) সার্থক প্রচলন করেন। সংস্কৃত বা প্রাচীন প্রাকৃত কবিতায় অন্ত্যমিলের কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু অপভ্রংশের দোহাগুলোতে এই অন্ত্যমিলের ব্যবহার শুরু হয় এবং এ থেকেই পরবর্তীকালে বাংলাসহ অন্যান্য নব্য দেশিয় ভাষার ছন্দে মিলের (Rhyme scheme) উদ্ভব ঘটে, যা আধুনিক কবিতার এক অপরিহার্য অঙ্গ।

পরবর্তী অপভ্রংশ বা অবহট্ঠ এবং ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য (Late Apabhramsha / Abahattha and Secular Literature)

অপভ্রংশের একেবারে শেষ পর্যায়টিকে ভাষাবিজ্ঞানীরা ‘অবহট্ঠ’ (Abahattha) নাম দিয়েছেন। এই অবহট্ঠ ভাষাতেই রচিত হয়েছে চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত বৈয়াকরণ ও ছন্দোবিশারদ পিঙ্গলাচার্যের ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ এবং পঞ্চদশ শতকের প্রসিদ্ধ মৈথিলী ও বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাব্য ‘কীর্তিলতা’। বিদ্যাপতি তাঁর এই অবহট্ঠ ভাষাকে ‘দেসিল বঅণা’ বা দেশি বচন বলে অভিহিত করেছিলেন।

এছাড়া এই যুগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ কাব্য হলো আবদুর রহমান (অদ্দহমান) রচিত ‘সন্দেশ রাসক’। এটি একটি বিরহকাব্য, যা প্রমাণ করে যে অপভ্রংশ কেবল হিন্দু, বৌদ্ধ বা জৈনদের ধর্মীয় ভাষার গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না, বরং মুসলিম কবিরাও এই ভাষাকে সাহিত্য রচনার মাধ্যম হিসেবে অত্যন্ত সাবলীলভাবে গ্রহণ করেছিলেন।

ছন্দ ও অলংকারে অপভ্রংশের অবদান (Contribution to Prosody and Metrics)

ভারতীয় ছন্দশাস্ত্রের ইতিহাসে অপভ্রংশ ভাষার অবদান অকল্পনীয়। সংস্কৃত ভাষার ছন্দগুলো মূলত ছিল অক্ষরবৃত্ত বা বর্ণবৃত্ত (Syllabo-quantitative), যেখানে লঘু ও গুরু অক্ষরের নির্দিষ্ট বিন্যাস মেনে চলতে হতো। কিন্তু অপভ্রংশ ভাষায় প্রথম ‘মাত্রাবৃত্ত’ (Moraic) ছন্দের ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

পিঙ্গলাচার্যের ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ গ্রন্থে মাত্রাবৃত্ত ও বর্ণবৃত্ত উভয় জাতীয় ছন্দেরই অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা রয়েছে। পিঙ্গল উদাহরণসহ যেসব ছন্দের আলোচনা করেছেন, সে সবের মধ্যে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের উল্লেখযোগ্য রূপগুলো হলো: গাহা (গাথা), বিগ্গাহা, উগ্গাহা, দোহা, রোলা, ছপ্পঅ (ছপয়), কববলক্খণ, দোঅই (দ্বিপদী) প্রভৃতি। আর বর্ণবৃত্ত ছন্দের মধ্যে পঞ্চাল, মন্দর, মালতী, মল্লিকা, রূপমালা, তোটক, চাসর, চ্চচরী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ‘দোহা’ এবং ‘চৌপাই’ ছন্দ দুটি অপভ্রংশ সাহিত্যে এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে, পরবর্তীকালে হিন্দি সাহিত্যে তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ এবং বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলি ও মঙ্গলকাব্যগুলোতে এই ছন্দগুলোর ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রাকৃতপৈঙ্গল গ্রন্থে এসব ছন্দের উদাহরণ হিসেবে তিনি যে শ্লোকগুলি উদ্ধৃত করেছেন, সেগুলির সাহিত্যিক এবং কাব্যিক মূল্যও অনস্বীকার্য।

উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, অপভ্রংশ ভাষা ভারতীয় সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে কোনো বিচ্ছিন্ন বা ক্ষয়িষ্ণু অধ্যায় নয়। এটি হলো একটি সজীব ও প্রাণবন্ত ভাষা-প্রবাহ, যা প্রাচীন ভারতের ধ্রুপদী ভাষিক কাঠিন্যকে ভেঙে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার সাথে সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। সংস্কৃতের গাম্ভীর্য এবং দেশি ভাষার সারল্য—এই দুইয়ের এক অপূর্ব রসায়ন ঘটেছিল অপভ্রংশে। জৈন মহাকবিদের ভক্তিভাব, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের গুহ্য সাধনতত্ত্ব, এবং লোকজ কবিদের প্রেম ও বিরহের গাথায় সমৃদ্ধ এই অপভ্রংশ ভাষাই মূলত আধুনিক ভারতের সমস্ত প্রাদেশিক ভাষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়ে গেছে।